ধ্বংসের ছায়া: মুন্সীগঞ্জের যুবসমাজ

মুন্সীগঞ্জের সবুজ প্রান্তর ও ঐতিহ্যের দীর্ঘ পথ ধরে আজ বইছে এক বিষাক্ত বাতাস—সেটি হলো মাদকাসক্তির আগ্রাসন। এই নীরব মহামারি কেবল ব্যক্তিজীবন নয়, আঘাত হানছে সমাজের মূল কাঠামোয়, গ্রাস করছে পরিবারের শান্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বপ্ন। মাদকের এই সর্বগ্রাসী প্রভাব মুন্সীগঞ্জের জনজীবনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, যা দ্রুত নিরাময় না হলে পুরো সমাজ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।
মাদকদ্রব্য—তা ইয়াবা, গাঁজা বা ফেন্সিডিল যা-ই হোক না কেন—এটি মুন্সীগঞ্জের প্রতিটি স্তরে তার বিধ্বংসী ছাপ রাখছে। এটি কেবল নেশা নয়, বরং এক ‘সামাজিক ক্যান্সার’ যা নীরবচ্ছিন্নভাবে সব কিছু ধ্বংস করে চলেছে। মাদকাসক্ত সন্তান বা স্বামী-স্ত্রী পারিবারিক শান্তি কেড়ে নেয়। পরিবারে শুরু হয় কলহ, অবিশ্বাস ও অর্থনৈতিক টানাপোড়েন। নেশার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে।
নেশার চাহিদা মেটাতে যুবসমাজ দ্রুত জড়িয়ে পড়ছে ছোটখাটো চুরি, ছিনতাই, এমনকি বড় ধরনের অপরাধেও। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির এটি এক প্রধান কারণ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়া, পড়ালেখায় মনোযোগের অভাব এবং উচ্ছৃঙ্খল আচরণ মাদকের প্রভাবের সরাসরি ফল। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
মাদকাসক্তি মানুষকে মানবিক মূল্যবোধ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। সমাজ থেকে সহানুভূতি, দায়িত্ববোধ এবং নৈতিকতা দ্রুত বিলীন হতে শুরু করে। মুন্সীগঞ্জের নদী ও মাঠের যে প্রাণবন্ত তারুণ্য একসময় দেশের ভবিষ্যৎ গড়ত, সেই তারুণ্য কেন আজ মাদকের কাছে আত্মসমর্পিত? এই প্রশ্নটিই এখন সমাজের বিবেককে দংশন করছে। এই গভীর অন্ধকার থেকে মুন্সীগঞ্জকে মুক্ত করতে হলে প্রয়োজন সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ। মাদক থেকে মুক্ত হওয়ার পথ কঠিন হলেও, তা অসম্ভব নয়। এটি কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাজ নয়, বরং সমাজ, পরিবার এবং ব্যক্তির সম্মিলিত অঙ্গীকার। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো নিয়ে নিয়মিত ও উন্মুক্ত আলোচনা করা। মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য সামাজিক সংগঠনগুলোর মাধ্যমে মাদকের বিরুদ্ধে নৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা। যুবকদের খেলাধুলা, শিল্প ও সুস্থ বিনোদনের দিকে উৎসাহিত করা, যাতে তাদের অবসর সময় গঠনমূলক কাজে ব্যয় হয়।
মুন্সীগঞ্জে মাদকমুক্তির জন্য পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা, যেখানে আসক্ত ব্যক্তিরা বিনামূল্যে বা স্বল্প খরচে চিকিৎসা নিতে পারে।
চিকিৎসার পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিকে পরিবার থেকে মানসিক ও আবেগময় সমর্থন দেওয়া, যা সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

মাদকের উৎস এবং স্থানীয় ডিলারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা।
মুন্সীগঞ্জের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে মাদকের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নজরদারি বাড়ানো।
মুন্সীগঞ্জকে মাদকের অভিশাপ থেকে বাঁচাতে হলে প্রতিটি পরিবারকে এখন সচেতন হতে হবে, প্রতিটি তরুণকে আশার আলো দেখতে হবে। যদি আমরা এখন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ না করি, তবে এই ঐতিহ্যবাহী জনপদ তার প্রাণশক্তি হারাবে। মাদকের বিরুদ্ধে এই লড়াইয়ে জয়ী হওয়াই এখন মুন্সীগঞ্জবাসীর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পরবর্তী পদক্ষেপ







