সারা বাংলাআমাদের মুন্সিগঞ্জ​সাইড স্টোরি

মুক্তিযুদ্ধের শহীদ সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন

আলীম আল রশীদ :
নিজাম উদ্দিন আহমেদ  বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে অকুতোভয় নির্ভীক  সাংবাদিক ও শহীদ বুদ্ধিজীবী। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ লগ্নে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অংশ হিসাবে তিনি অপহৃত ও পরে শহীদ হন।
সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমদের জন্ম ১৯২৯ সালে মুন্সিগঞ্জের লৌহজং থানার মাওয়া গ্রামে। তাঁর পিতা সিরাজুল ইসলাম এবং মা ফাতেমা বেগম। পিতা ছিলেন জাহাজের অডিট অফিসার।
১৯৮৮ সালের বহুল আলোচিত ও নৃশংস হত্যাকান্ডের শিকার শারমিন রীমা তাঁরই কন্যা।
১৯৪৬ সালে বিক্রমপুর ভাগ্যকুল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাস করেন নিজাম উদ্দিন আহমদ এরপর  ভর্তি হন মুন্সিগঞ্জের সরকারি হরগঙ্গা কলেজে। সেখানকার ছাত্রাবস্থায় তিনি সম্পৃক্ত হন রাজনীতিতে।
১৯৬৫ সালে ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্রের অধীনে নির্বাচন দিলে নিজাম উদ্দিন আহমদ সেই নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
নিজাম উদ্দিন আহমদ ৫২’র ভাষা আন্দোলন, ৫৪’র যুক্তফন্ট নির্বাচন, ৬২’র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬’র ছয়দফা, ৬৯’র ছাত্রদের ১১ দফা ও গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন তিনি।
নিজাম উদ্দিন আহমদ ১৯৫০ সালে ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অবস্থায় করাচি থেকে প্রকাশিত ‘সিভিল এন্ড মিলিটারি গেজেট’ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন।
এরপর নিজাম উদ্দিন আহমদ আরও বহু পত্রপত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে নিজের প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়ে পাঠক মহলে নন্দিত হন। এরমধ্যে  দৈনিক মিল্লাত, দৈনিক আজাদ, ঢাকা টাইমস, পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন।
দেশীয় পত্রপত্রিকা ব্যতীত আরও সাংবাদিকতা করেন আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এরমধ্যে বার্তা সংস্থা এপিপি, ইউপিআই, পিপিআই, রয়টার, এএফপি এবং বিবিসিতেও কাজ করেন নিজাম উদ্দিন আহমদ।
১৯৫৯ সালে নিজাম উদ্দিন আহমদ পাকিস্তান প্রেস ইন্টারন্যাশনাল সংস্থায় যোগ দেন। ঢাকায় এ সংস্থার অফিস স্থাপিত হলে তিনি সংস্থার সম্পাদক হন। ১৯৭১ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি পিপিআই এর জেনারেল ম্যানেজার ছিলেন।
এ সংস্থা ছাড়াও নিজাম উদ্দিন আহমদ ইউপিআই, বিবিসি, অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব আমেরিকার ঢাকাস্থ সংবাদদাতার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি যক্ষ্মা সমিতি, কেন্দ্রীয় পাট বোর্ড, ফিল্ম সেন্সর বোর্ডসহ কাতপয় সংস্থার সদস্য ছিলেন।
যুদ্ধ চলাকালীন ঢাকায় তখন বিদেশি গণমাধ্যমের বেশ কয়েকজন প্রতিনিধি ছিলেন। তাদের প্রতিদিনই নিজাম উদ্দিন আহমদ জানাতেন গণহত্যার সবশেষ খবর।
নিজাম উদ্দিন আহমদ দেশের অভ্যন্তরের ঘটনা ও যুদ্ধের যাবতীয় বর্ণনা নিয়মিত বিবিসিকে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশি গণমাধ্যমকে জানাতেন, যা বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনে বিশেষ  ভূমিকা রাখে।
১৯৭১ সালের ১২ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার ১২ নম্বর রোকনপুরের বাসা থেকে নিজাম উদ্দিন আহমদকে অপহরণ করে নিয়ে যায় পাকিস্তানি হানাদার ও আলবদর বাহিনী। আজ অবধি সন্ধান মেলেনি তাঁর।
১৯৯৩ সালে অকুতোভয় নির্ভীক সাংবাদিকতা এবং মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য শহীদ নিজাম উদ্দিন আহমদকে মরনোত্তর একুশে পদক দেওয়া হয়।
আজ মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বরোচিত বাহিনীর হাতে নিহত শহীদ সাংবাদিক নিজাম উদ্দিন আহমদ এর প্রয়াণ দিবস আজকের এই দিনে উনাকে গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button