ঐতিহ্যের অশ্রুঝরা আড়ত: হাসাইলের বিষণ্ন বেলা

মুন্সীগঞ্জের টংগিবাড়ী উপজেলার হাসাইল বানারী ইউনিয়নের তীরে একসময় ছিল এক প্রাণের স্পন্দন, এক কর্মমুখর জগৎ—নাম তার হাসাইল মৎস্য আড়ত। এই আড়ত শুধু মাছ কেনা-বেচার জায়গা ছিল না; এটি ছিল স্থানীয় সংস্কৃতি, অর্থনীতির হৃদপিণ্ড এবং অসংখ্য জেলে পরিবারের জীবনের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু প্রকৃতির নির্মমতা আর সময়ের বদলে যাওয়া হাওয়ায় সেই ঐতিহ্যবাহী আড়ত আজ বিলুপ্তির পথে, যেন এক দীর্ঘশ্বাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একসময় এই আড়ত ছিল ক্রেতা-বিক্রেতা, জেলে ও আড়তদারদের এক বিশাল মিলনমেলা। ভোর হতে না হতেই শুরু হতো মাছের হাঁকডাক, ক্রেতাদের দরদাম, আর কর্মচাঞ্চল্যের এক মধুর কোলাহল। পদ্মা ও আশপাশের নদী থেকে সদ্য ধরা মাছের ঝলকানি দেখতে দেখতে কেটে যেত দিন। কিন্তু আজকের হাসাইল আড়ত এক বিষণ্ন নীরবতা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
আড়তদাররা জানান, “আগে প্রতিদিন ভোর মানেই ছিল ভিড়, ছিল উৎসব। এখন যেদিন একটু মাছ আসে, সেদিনও ক্রেতা নেই আগের মতো।” এই পরিবর্তন যেন কেবল ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, এটি যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে আসা এক জীবিকার স্বপ্নভঙ্গ। নতুন প্রজন্ম তাই এই অনিশ্চিত পেশায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছে, ফলে ঐতিহ্যের এই ধারা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে।
স্থানীয় জেলেদের কণ্ঠে এখন কেবল অভিযোগ আর হতাশার সুর। তারা জানান, এই ঐতিহ্য হারানোর মূল কারণ প্রকৃতির রুদ্ররূপ এবং মানুষের অসচেতনতা।
একসময়ের খরস্রোতা পদ্মা আজ ম্লান। নদীর গভীরতা কমে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে। জেলেদের জালে মাছ ধরা পড়ছে না, ফলে সরবরাহ কমে গেছে দ্রুত।মৎস্য সম্পদ সংরক্ষণের তোয়াক্কা না করে নদীতে অবাধে ক্ষতিকর কারেন্ট জালের ব্যবহার চলছে। এই জাল ছোট-বড় সব মাছ indiscriminately ধরে ফেলছে, যা মৎস্য ভান্ডারকে শূন্য করে দিচ্ছে।
জেলেদের অভিযোগ, মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণ বিষয়ে কার্যকর সরকারি পদক্ষেপের অভাব রয়েছে, যার ফলে মৎস্য সম্পদ রক্ষা করা যাচ্ছে না।
এই কারণগুলো মিলে হাসাইল মৎস্য আড়তের অর্থনীতিকে ভেঙে দিয়েছে। কোলাহলপূর্ণ এই আড়ত এখন যেন প্রকৃতির নীরব প্রতিশোধের শিকার।
স্থানীয়রা মনে করেন, হাসাইল মৎস্য আড়তের পুরনো জৌলুস ফিরিয়ে আনা অসম্ভব নয়। এই ঐতিহ্যকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ এবং কঠোর পদক্ষেপ।
পদ্মার নাব্যতা বৃদ্ধি, অবৈধ কারেন্ট জাল ব্যবহারে কঠোর নজরদারি এবং মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
আড়তকে আধুনিক সুবিধা দিয়ে সাজানো, যা ক্রেতাদের আকর্ষণ বাড়াবে এবং জেলেদের ভালো দাম নিশ্চিত করবে।
দীর্ঘমেয়াদী ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা, যাতে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটি কেবল ইতিহাসের পাতায় বিলীন না হয়ে যায়।
হাসাইল মৎস্য আড়ত আজ বিলুপ্তির পথে দাঁড়িয়ে আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, পরিবেশ ও ঐতিহ্য একে অপরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এই নীরব আড়তের কোলাহল ফিরিয়ে আনতে না পারলে, মুন্সীগঞ্জের মৎস্যজীবী জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় চিরতরে মুছে যাবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ






