বিত্তশালীদের স্বপ্ন গড়তে শ্রমিকের রক্ত বিত্তের সৌধে চাপা পড়া জীবনগাথা

আকাশ ছুঁতে চাওয়া ইমারত, অথবা শখের বশে গড়া মুন্সীগঞ্জের সেই সুবিশাল কাঠের ঘর—প্রতিটি দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের ভিত্তিপ্রস্তরে চাপা পড়ে আছে অসংখ্য শ্রমিকের নীরব আত্মত্যাগ। বিত্তশালীর চোখে যখন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নকশা, তখন শ্রমিকের জীবনে নেমে আসে কাঠ চেরাইয়ের গুঁড়িময়, অকালমৃত্যুর ছায়া। এই উপাখ্যান যেন প্রকৃতির দুই বিপরীত স্রোতের মিলন—একদিকে প্রাচুর্যের ঝলক, অন্যদিকে জীবনের ধূসর মলিনতা।
ভাই ভাই স-মিলের পঞ্চাশোর্ধ্ব করিম মাদবরের কথা ভাবুন। শীতের রাতে যখন মুন্সীগঞ্জের সম্পন্ন গৃহস্থ তার নতুন বানানো কাঠের ঘরে উষ্ণ কম্বলে স্বপ্নের জাল বুনছেন, ঠিক তখনই, সেই ঘরের কাঠে হাত লাগানো করিম হয়তো ঠান্ডাজনিত কাশির তীব্রতায় ঘুমহীন এক রাত পার করছেন। তার ফুসফুসের গভীরে জমা হচ্ছে সেই সূক্ষ্ম কাঠের গুঁড়ি, যা একদিন হয়ে উঠবে তার শ্বাসরুদ্ধকর শেষযাত্রার কারণ।
বিত্তশালীর স্বপ্ন আকাশচুম্বী। তারা চান নিখুঁত মাপের মজবুত কাঠ, যা তাদের ঐতিহ্য ও রুচির প্রতীক হবে। সেই কাঠ চেরাই করতে গিয়ে মফিজ চোকদারের বয়স ৫৫ পেরিয়েছে। দশ বছর ধরে মেশিনের শব্দ আর কাঠের ভার টানতে টানতে তার মেরুদণ্ড আজ কুঁজো, দম বন্ধ হয়ে আসে ঘন ঘন। অথচ, এই নিঃশ্বাস বন্ধ হওয়া কষ্টই বিত্তশালীর বাড়ির বাতায়ন দিয়ে মুক্ত বাতাস প্রবেশের পথ করে দিচ্ছে।
এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য! এক পক্ষ, সামান্য মজুরির বিনিময়ে জীবনের ঝুঁকি কিনে নেয়; অন্য পক্ষ, সেই ঝুঁকিকে পুঁজি করে গড়ে তোলে নিরাপদ ও সুসজ্জিত আশ্রয়। যে গুঁড়ি মিশে আছে করিমের থুথুতে, সেই গুঁড়িই একদিন মসৃণ পলিশের মাধ্যমে পরিণত হয় বিত্তশালীর আভিজাত্যের পালঙ্কে।
এই শ্রমিকদের জীবন যেন এক চলমান কবিতা—যা গভীর বেদনা ও নীরব প্রতিবাদের সুরে বাঁধা। তারা জানেন, তাদের শ্রমের ফসল উপভোগ করবে অন্য কেউ, কিন্তু তবুও, পরিবারকে দু’মুঠো ভাত জোগাতে তারা হাসি মুখে মেনে নেন মৃত্যুর হাতছানি। তারা যেন আধুনিক সভ্যতার সেই অজ্ঞাত স্থপতি, যাদের নাম লেখা থাকে না শ্বেত পাথরের ফলকে, কেবল বুকের গভীরে জমে থাকা যন্ত্রণার ইতিহাস হয়ে রয়।
আসলে, প্রতিটি কাঠ চেরাই স-মিল যেন এক নীরব বলিদান ক্ষেত্র—যেখানে শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে বিত্তবানদের স্বপ্ন হয় পূর্ণতা। তাদের জীবন-সংগ্রামের এই করুণ চিত্রটি শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক অপূরণীয় হৃদয়ের ক্ষত হয়েই থাকে, যা সমৃদ্ধির আড়ালে চিরকাল উপেক্ষিত।








