সারা বাংলা​সাইড স্টোরি

​ টংগিবাড়ীর প্রতিরোধ: মুক্তিপাগল জনতা

​১৯৭১ সালের মার্চ মাসের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর পর, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন গোটা পূর্ব বাংলাকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঁধতে উন্মত্ত, তখন মুন্সীগঞ্জের (তৎকালীন বিক্রমপুর) সাধারণ মানুষ চুপ করে বসে থাকেনি। ফুলদী নদীর পাড়ের গণহত্যার আগেই মুন্সীগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে মুক্তি সংগ্রামের স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে পড়েছিল। টংগিবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড় এলাকা ছিল এই প্রতিরোধের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।
​সে সময় ঢাকা থেকে আসা কিছু তরুণ এবং স্থানীয় ছাত্র-জনতা মিলে গড়ে তুলেছিল প্রাথমিক প্রতিরোধ বাহিনী। তাদের কাছে উন্নত অস্ত্র ছিল না, ছিল কেবল স্বাধীনতার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং মাতৃভূমি রক্ষার অদম্য সাহস। তাদের লক্ষ্য ছিল—যে কোনো মূল্যে হানাদার বাহিনীকে মুন্সীগঞ্জের মাটিতে নিজেদের ঘাঁটি গাড়তে দেওয়া হবে না।

​পাকিস্তানি বাহিনী যখন মুন্সীগঞ্জ দখলের পরিকল্পনা করে, তখন তাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল এই অঞ্চলের নদীবাহিত যোগাযোগ পথগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা। এই সময়েই টংগিবাড়ীর অঞ্চলের মুক্তিকামী জনতা নিজেদের প্রস্তুত করে তোলে।
​প্রতিরোধ যোদ্ধারা মূলত তীর-ধনুক, বল্লম, লাঠি এবং হাতে তৈরি সামান্য কিছু অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু তাদের সাহস ছিল হিমালয়ের মতো অটুট। স্থানীয় কৃষকরা লাঙল ফেলে, জেলেরা জাল গুটিয়ে, ছাত্ররা বই ছেড়ে হাতে তুলে নিয়েছিলেন যা পেয়েছিলেন তাই। দিঘিরপাড় অঞ্চলের মানুষেরা রাতের অন্ধকারে গোপনে প্রশিক্ষণ নিতেন এবং শপথ নিতেন—”রক্ত দেব, কিন্তু মাটি দেব না।” এই অপ্রস্তুত প্রতিরোধই পরবর্তীতে এক কিংবদন্তী যুদ্ধের জন্ম দেয়।
​আক্রমণের দিনটি ছিল রণকৌশলের এক উজ্জ্বল নিদর্শন। হানাদার বাহিনী যখন দিঘিরপাড়ের দিকে এগোতে থাকে, তখন মুক্তিপাগল জনতা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী অবস্থান নেয়।
​প্রথমে স্থানীয় কিছু যুবক নিজেদের জীবন বিপন্ন করে নদীর পাড়ে ও রাস্তার সংযোগস্থলে মাইন ও বিস্ফোরক বসিয়ে রেখেছিল। পাকিস্তানি সেনাদের বহনকারী যান বা নৌবহর সেই পথে আসা মাত্রই প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। এই আকস্মিক হামলা হানাদারদের মধ্যে চরম বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। এরপরই মুক্তিপাগল জনতা তাদের হাতে থাকা সামান্য অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
​এটি কেবল অস্ত্রের লড়াই ছিল না; এটি ছিল রণকৌশল, দেশপ্রেম এবং স্থানীয় মানুষের ঐক্যের লড়াই। তারা জানতেন, সম্মুখ যুদ্ধে জেতা অসম্ভব; তাই গেরিলা কৌশলে তারা হানাদারদের আঘাত করতে থাকেন। দিনের শেষে, টংগিবাড়ীর এই প্রতিরোধ যুদ্ধে হানাদার বাহিনী তাদের লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়।

​দিঘিরপাড়ের এই প্রতিরোধ যুদ্ধটি ছিল মুন্সীগঞ্জ তথা বিক্রমপুরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ টার্নিং পয়েন্ট। আপাতদৃষ্টিতে এটি হয়তো ছোট একটি যুদ্ধ ছিল, কিন্তু এর ফল ছিল সুদূরপ্রসারী:
স্থানীয় জনগণের মধ্যে এই যুদ্ধ প্রমাণ করে যে, সংঘবদ্ধ হলে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হানাদারদেরও পরাজিত করা সম্ভব।
এই সাফল্য পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও উপজেলাগুলোতে প্রতিরোধের আগুনকে আরও তীব্র করে তোলে।
এই অঞ্চলে গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার কৌশল ও সাহস তৈরি হয়।
​টংগিবাড়ী-দিঘিরপাড়ের এই বীরত্বগাঁথা মুন্সীগঞ্জের মাটিতে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম সফল প্রতিরোধ হিসেবে আজও প্রেরণা যোগায়।

​আজ হয়তো সেই প্রতিরোধের স্থানগুলিতে নীরবতা নেমে এসেছে, কিন্তু স্থানীয় প্রবীণদের স্মৃতিতে এবং মুন্সীগঞ্জের ইতিহাসে এই বীরত্বগাঁথা অমর হয়ে আছে। টংগিবাড়ী-দিঘিরপাড়ের প্রতিরোধ যুদ্ধ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা অর্জনের লড়াইয়ে কেবল অস্ত্রই শেষ কথা নয়, সাহস, দেশপ্রেম এবং ঐক্য তার চেয়েও বড় শক্তি।
​এই বীরদের আত্মত্যাগ আমাদের জন্য এক পবিত্র আমানত। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে এই ইতিহাস বুকে ধারণ করতে হবে, যাতে টংগিবাড়ীর মুক্তিকামী জনতা এবং ফুলদী নদীর শহীদদের রক্তদান কখনো বৃথা না যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button