আমাদের মুন্সিগঞ্জ

​প্রশাসন-চ্যালেঞ্জ:  গুয়াগাছিয়া পিয়াসের অঘোষিত রাজত্ব

​মুন্সীগঞ্জের গজারিয়াপাড়ের গুয়াগাছিয়া কেবল একটি ভূখণ্ড নয়, এটি এখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় অপরাধী চক্রের ক্ষমতার ভারসাম্যের এক প্রতীকী রণক্ষেত্র। এই জনপদের ‘সম্রাট’ পিয়াস, যার নামে ডজন ডজন মামলা ও হুলিয়া জারি রয়েছে, সে এখন কেবল একটি আঞ্চলিক দস্যুবাহিনীর প্রধান নয়; সে পরিণত হয়েছে প্রশাসনের কার্যকারিতা পরিমাপের এক নির্মম মানদণ্ডে।
চলতি বছর ​সেপ্টেম্বর মাসে যখন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা গুয়াগাছিয়া ক্যাম্প পরিদর্শনে এসে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা করেছিলেন যে, দস্যুবাহিনীর প্রধান নয়ন পিয়াস  ভারত চলে গেছে এবং দেশে ফেরা মাত্রই তার ঠিকানা হবে কেন্দ্রীয় কারাগার—তখন মানুষ আশার আলো দেখেছিল। সেই উচ্চ-পর্যায়ের প্রতিজ্ঞা জনগণের মনে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেই প্রতিজ্ঞা কেবলই শব্দে সীমাবদ্ধ থাকল।
​ খোঁজ নয়, প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া
​পিয়াসের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড প্রমাণ করে, সে কেবল আইন থেকে পালিয়ে বেড়ায় না, বরং প্রশাসনকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। মুন্সীগঞ্জ জেলা হানাদার মুক্ত দিবসের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিনে তার সদর্পে ঢাক-ঢোল বাজিয়ে গুয়াগাছিয়ায় আগমন এবং রাতভর তাণ্ডব চালানো—এটি কোনো সাধারণ অপরাধীর কাজ হতে পারে না। এটি একটি স্পষ্ট বার্তা: আইনের হুলিয়া তার জন্য প্রযোজ্য নয় এবং স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার প্রতিজ্ঞার চেয়ে তার ক্ষমতা বেশি।
​পিয়াসের এই প্রকাশ্য উপস্থিতি ও তাণ্ডব প্রশাসনের সেই সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিজ্ঞাকে সরাসরি উপহাস করেছে। প্রশ্ন উঠছে, উচ্চ-পর্যায়ের ঘোষণা সত্ত্বেও কেন তাকে গ্রেপ্তার করা গেল না? কেন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো তার ‘ভারতে চলে যাওয়ার’ তথ্যটি ভুল প্রমাণিত হওয়ার পরও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারল না?

​গুয়াগাছিয়ার ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক দিকটি হলো স্থানীয় প্রশাসনের ‘অসহায়ত্বের পরিচয়’। যখন একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা স্থানীয় নারীকে বলেন, মাত্র বিশ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে পিয়াস বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে আহত হওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না, তখন এটি কেবল পুলিশি কৌশল নয়, এটি যেন আইনের শাসনের কাছে অপরাধের ক্ষমতার এক প্রকার ‘আত্মসমর্পণ’।
​এই পরিস্থিতি দুটি গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করে:
​লজিস্টিক দুর্বলতা:
যদি সত্যিই প্রশাসনের এত কম সংখ্যক পুলিশ সদস্য থাকে যে তারা একটি সশস্ত্র দস্যু বাহিনীর মুখোমুখি হতে ভয় পান, তবে এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার লজিস্টিক দুর্বলতার চরম উদাহরণ।
রহস্যময় সমীহ: নাকি এর পেছনে রয়েছে কোনো রহস্যময় যোগসূত্র? পিয়াসকে প্রকাশ্যে আস্কারা দেওয়ার মাধ্যমে কি কোনো অদৃশ্য সুবিধা বা রাজনৈতিক ক্ষমতা কাজ করছে? তার এতদিনের নিরঙ্কুশ রাজত্ব কি স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোর নীরব সমর্থন ছাড়া সম্ভব হতো?
​ ভবিষ্যতের অন্ধকার ও তারুণ্যের হতাশা
​পিয়াসের গ্রেপ্তার না হওয়া এবং তার তাণ্ডবের পর প্রশাসনের ধীরগতিতে যৌথ অভিযান (যখন সে নিরাপদে সরে যায়) এই বার্তা দেয় যে, অপরাধীরা পার পেয়ে যেতে পারে। এটি কেবল গুয়াগাছিয়াবাসীর নিরাপত্তা নয়, বরং এই অঞ্চলের তরুণ প্রজন্মের মনেও গভীর হতাশার জন্ম দেয়। যখন যুবকরা দেখে যে আইন মেনে চলা বা পরিশ্রম করে জীবন গড়ার চেয়ে অপরাধের পথ অবলম্বন করা বেশি নিরাপদ ও লাভজনক, তখন তা সমাজে নৈরাজ্য ও নৈতিক স্খলনের জন্ম দেয়।
​গুয়াগাছিয়ার এই দস্যু-সম্রাটের কাহিনিটি কেবল একটি অপরাধের বিবরণ নয়, এটি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার অধিকারের ওপর এক মারাত্মক আঘাতের বিশ্লেষণ। এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনকে কেবল লোকদেখানো অভিযান নয়, বরং দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক সংকল্প দেখাতে হবে—যাতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার প্রতিজ্ঞা কার্যকর হয় এবং নয়ন -পিয়াস ‘ও লালুদের অঘোষিত রাজত্ব’ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button