আমাদের মুন্সিগঞ্জ​সাইড স্টোরিসারা বাংলা

ফুলদী নদীর পাড়ের গণহত্যা:

ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায় (৯ মে ১৯৭১)
​মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার ফুলদী নদীর পাড়ে সংঘটিত এই গণহত্যাটি একাত্তরের বর্বরতার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। একদিনেই আনুমানিক ৩৬০ জনেরও বেশি নিরীহ মানুষকে এখানে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
​১৯৭১ সালের মে মাস, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাথমিক পর্যায়। মুন্সীগঞ্জ (তৎকালীন বিক্রমপুর) অঞ্চল জুড়ে মুক্তিকামী জনতার প্রতিরোধ তখনো দমে যায়নি। বিশেষত গজারিয়া উপজেলা ছিল ঢাকা-চট্টগ্রামের প্রবেশপথের কাছে হওয়ায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
​ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকাররা এই অঞ্চলে মুক্তি সংগ্রামকে কঠোর হাতে দমন করতে বদ্ধপরিকর ছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল,​মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের এবং তাদের আশ্রয়দাতাদের ভয় দেখিয়ে শায়েস্তা করা।
,এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করে স্থানীয় প্রতিরোধ সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেওয়া।
​এই লক্ষ্য পূরণের অংশ হিসেবে, ফুলদী নদীর পাড়ের ভাটেরচর, মিয়াজীপাড়া, পুরান বাউশিয়া, লোহাবোর, কাজীপাড়া, চম্পকনগরসহ প্রায় ১০টি গ্রামকে টার্গেট করা হয়। এই গ্রামগুলো ছিল নদী-তীরবর্তী, যা পাকিস্তানি সৈন্যদের দ্রুত আক্রমণ ও পশ্চাদপসরণের সুযোগ দিত।

​১৯৭১ সালের ৯ মে, রবিবার, গজারিয়া অঞ্চলের মানুষের জীবনে নেমে আসে এক চরম বিভীষিকা। স্থানীয় রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় সুসজ্জিত পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথেই অতর্কিত আক্রমণ শুরু করে।

হানাদার বাহিনী প্রথমে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে ফুলদী নদীর পাড়ের গ্রামগুলো চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলে। সেনারা গ্রামগুলোতে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে এবং পেট্রোল বা গানপাউডার ব্যবহার করে ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেয়। মুহূর্তের মধ্যে শান্ত গ্রামগুলো পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। গুলি ও আগুনের মুখে ভীতসন্ত্রস্ত  বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শত শত গ্রামবাসী প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করলে তাদের ধরে এনে ফুলদী নদীর পাড়ে খোলা জায়গায় জড়ো করা হয়।
জড়ো করা অসহায় মানুষগুলোকে লাইনে দাঁড় করানো হয়। এরপর ঠান্ডা মাথায়, বিন্দুমাত্র মায়া-দয়া ছাড়াই হানাদার সৈন্যরা ভারী অস্ত্র (সম্ভবত লাইট মেশিন গান বা সাব-মেশিন গান) ব্যবহার করে ব্রাশফায়ারে তাদের ঝাঁঝরা করে দেয়। এই হত্যাযজ্ঞ চলে একটানা কয়েক ঘণ্টা ধরে।
​মুন্সীগঞ্জ জেলার ইতিহাসে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় গণহত্যা।
এই একদিনের হত্যাযজ্ঞে আনুমানিক ৩৬০ জনেরও বেশি নিরীহ গ্রামবাসী নির্মমভাবে শহীদ হন। অনেক পরিবারে পুরুষ সদস্যদের প্রায় কেউই জীবিত থাকেনি। গণহত্যার পর শহীদদের লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নদীর জল মুহূর্তেই রক্তে লাল হয়ে ওঠে। বাকি লাশগুলো স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় দ্রুত গণকবর দেওয়া হয়, যাতে এই নৃশংসতার কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট না থাকে।
অসংখ্য মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন এবং এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়ে।

​স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পর এই গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণ এবং শহীদদের প্রতি সম্মান জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। ফুলদী নদীর পাড়ে সেই শহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় এবং তাঁদের আত্মত্যাগের মহিমা ধরে রাখতে বর্তমানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, এটি গজারিয়াবাসীর শোক ও প্রতিবাদের নীরব প্রতীক।
প্রতি বছর ৯ মে দিনটিকে স্মরণ করে স্থানীয় প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ এবং সাধারণ মানুষ এখানে শোক র ্যালী এবং শ্রদ্ধা নিবেদনের আয়োজন করেন। এই দিনে শহীদদের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয় এবং তাঁদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়।
​ফুলদী নদীর পাড়ের এই গণহত্যা মুন্সীগঞ্জের সাধারণ মানুষের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচার এবং তাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ইতিহাস আমাদের জাতিসত্তা ও স্বাধীনতা অর্জনের মূল্যে বিশাল ত্যাগের কথা সর্বদা স্মরণ করিয়ে দেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button