শহরের হৃদয়ে বধ্যভূমি: একাত্তরের অভিশাপ

মুন্সীগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে, যেখানে একসময় জ্ঞানের আলো ছড়াতো, সেই সরকারি হরগঙ্গা কলেজ ১৯৭১ সালের মে মাস থেকে পরিণত হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান সামরিক ছাউনি এবং এক বিভীষিকাময় টর্চার সেলে। এটি ছিল মুন্সীগঞ্জ শহরে পাকবাহিনীর প্রথম এবং প্রধান ঘাঁটি বা ‘ক্যান্টনমেন্ট’। শহর এবং প্রধান নদীপথের নৈকট্যের কারণে কৌশলগতভাবে এটি তাদের জন্য ছিল অত্যন্ত নিরাপদ। কিন্তু এই নিরাপত্তা মানেই ছিল মুন্সীগঞ্জবাসীর জন্য সীমাহীন আতঙ্ক।
হাজারো তরুণ-তরুণীর পদচারণায় মুখর থাকা এই বিদ্যাপীঠের শ্রেণিকক্ষ ও হলগুলো পরিণত হয়েছিল অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। বইয়ের পাতা ও চকের গন্ধের বদলে বাতাসে মিশে গিয়েছিল মানুষের রক্ত আর লাশের গন্ধ। শিক্ষা ও সংস্কৃতির আঙিনায় নেমে এসেছিল বর্বরতার কালো ছায়া।

টর্চার সেল: যেখানে মানবিকতা হার মানে
হরগঙ্গা কলেজের প্রতিটি ইট-পাথর যেন আজও নীরবে বহন করে চলেছে সেই সময়ের অকথ্য অত্যাচারের সাক্ষ্য। কলেজের বিভিন্ন কক্ষ রূপান্তরিত হয়েছিল ভয়াবহ নির্যাতন কেন্দ্রে (টর্চার সেল)।
মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক, ছাত্র, শিক্ষক এবং সাধারণ নিরীহ মানুষকে ধরে এনে এখানে চালানো হতো অমানুষিক নিপীড়ন। তথ্য আদায়ের জন্য বন্দীদের উপর নেমে আসত অকথ্য শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার। পুরুষদের পাশাপাশি অনেক নারীকেও এখানে নির্যাতন করা হয়েছিল, যা ছিল বাঙালি জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার সুপরিকল্পিত কৌশল। সেই কক্ষগুলোর দেয়াল হয়তো আজও চাপা দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয়ে আছে, যেখানে প্রতি মুহূর্তে উচ্চারিত হতো মৃত্যুযন্ত্রণার নীরব আর্তনাদ।
নির্যাতনের পর যেসব বন্দীকে হত্যা করা হতো, তাদের লাশ কলেজের ক্যাম্পাসের পূর্ব পাশে অবস্থিত একটি ডোবা বা নিচু জমিতে ফেলে দেওয়া হতো। ডোবাটি পরিণত হয়েছিল মুন্সীগঞ্জের প্রধান বধ্যভূমিতে। লাশগুলো মাটিচাপা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করত না বর্বর সেনারা। এই বধ্যভূমিটি ছিল মুন্সীগঞ্জের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি হানাদার বাহিনীর ঘৃণার প্রতীক। রাতের আঁধারে এখানে নিস্তব্ধ হয়ে যেত জীবনের শেষ স্পন্দন, মিশে যেত মাটির গভীরে।
১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১। যেদিন হানাদার বাহিনী মুন্সীগঞ্জ ছেড়ে পালিয়ে যায়, সেদিনই আবিষ্কৃত হয় এই নৃশংস বধ্যভূমি। মাটি খুঁড়ে বেরিয়ে আসে অসংখ্য শহীদের কঙ্কাল, হাড়গোড় এবং ছিন্নভিন্ন দেহাবশেষ। সেই দৃশ্য ছিল এতই মর্মান্তিক যে তা মুন্সীগঞ্জবাসীর দীর্ঘকাল ভুলতে পারেনি।
স্বাধীনতার পর, হরগঙ্গা কলেজ বধ্যভূমিতে আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের আত্মত্যাগকে সম্মান জানাতে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিস্তম্ভ। এই স্মৃতিস্তম্ভ কেবল কয়েকটি পাথর বা সিমেন্টের কাঠামো নয়; এটি মুন্সীগঞ্জের মুক্তিকামী মানুষের প্রতি পাকিস্তানি বাহিনীর পরিচালিত ভয়াবহ অত্যাচারের নীরব সাক্ষী এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের প্রতি এক নৈতিক অঙ্গীকার।
প্রতি বছর হানাদার মুক্ত দিবস (১১ ডিসেম্বর), বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস ১৪ ডিসেম্বর ও মহান বিজয় দিবসে (১৬ ডিসেম্বর) এই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধার ফুলে ভরে ওঠে। মুন্সীগঞ্জবাসী অশ্রুভেজা চোখে তাঁদের প্রিয়জনদের আত্মার শান্তি কামনা করেন। এই স্মৃতিস্তম্ভ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—এই স্বাধীনতা কত রক্ত, কত ত্যাগ আর কত চাপা কান্নার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে।
হরগঙ্গা কলেজ বধ্যভূমি মুন্সীগঞ্জের ইতিহাসে এক গভীর ক্ষতচিহ্ন, যা একই সাথে একাত্তরের বর্বরতা এবং বাঙালির অদম্য সাহসের প্রতীক। এটি আমাদের শেখায়, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের আত্মত্যাগ কখনো বৃথা যায় না।






