ঢেঁকির দীর্ঘশ্বাস: কালের কাঠের কফিন

মুন্সীগঞ্জের এক পরিত্যক্ত রান্নাঘরের কোণে, শত বছরের পুরোনো এক ঢেঁকি। তার গায়ে ধুলোর আস্তরণ, আর কাঠের শরীরে সময়ের ফাটল। রাতের অন্ধকারে সে যেন একাকী নিজের সাথে কথা বলছে…
আমি ঢেঁকি। আমার নাম ছিল ‘নবান্নের সুর’, আমার আরেক নাম ছিল ‘শ্রমের ছন্দ’। আজ আমি শুধু এক খণ্ড কাঠ, এক পরিত্যক্ত স্মৃতি। কিন্তু এই কাঠকে জড়িয়ে আছে বাংলার কত শত উৎসব, কত নারীর হাসি-কান্না!
আমার মনে পড়ে সেই রাতগুলো, যখন চারিদিকে নিস্তব্ধতা নেমে আসত। কিন্তু আমার কাঠের শরীর তখন জেগে উঠত নতুন ধানের ঘ্রাণে। বাড়ির ছোট বউটা যখন শাশুড়ির চোখ এড়িয়ে চুপিচুপি আমার ওপর পা রাখত, তার নিঃশ্বাসে মিশে থাকত ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর পিঠার লোভ। আমি অনুভব করতাম তার পায়ের নরম চাপ, তার হাতে ধরা ধানের স্পর্শ।
আমি শুধু চাল গুঁড়ো করিনি। আমি ছিলাম তাদের গোপন কথার সিন্দুক। মধ্যরাতে যখন ধান ভানার কাজ চলত, তখন বউ-ঝিয়েরা নিজেদের মনের কথা বলত—কারো বাপের বাড়ির জন্য মন কেমন করা, কারো স্বামীর বিদেশ যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ, আবার কারো নতুন গয়নার আবদার। আমার ‘ধুপ-ধাপ’ শব্দ সেই সব গোপন কথাকে ঢেকে দিত, আর আমি তাদের সব আবেগ নীরবে নিজের কাঠ-দেহে জমিয়ে রাখতাম। আমার শব্দ ছিল তাদের নিভৃত আলাপচারিতার নিরাপত্তা প্রাচীর।
একদিন, ছোট মেয়েটা আমার ওপর পা রেখেছিল প্রথমবার। ভয়ে ভয়ে সে পা তুলেছিল, তাল রাখতে পারছিল না। তার মা হেসে উঠে গান গেয়েছিলেন: “ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া…” সেই গান ছিল শুধু কাজ শেখানো নয়, তা ছিল এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সংস্কৃতি আর শ্রমের মর্যাদা হস্তান্তরের মন্ত্র।
আজ সেই সুর কোথায়? এখন আমার পাশেই পড়ে আছে একটি পুরোনো টিনের কৌটা। ওটা নাকি এখনকার ‘মিল থেকে আনা চাল’ রাখে। তার কোনো ছন্দ নেই, কোনো ঘ্রাণ নেই। যখন বিদ্যুৎ চলে যায়, তখনো সে নীরব। আর আমার দিন ছিল না রাত ছিল না, ছিলাম শ্রমের সঙ্গী।
এখন এখানে শুধু ইঁদুরের আনাগোনা। দিনের আলোয় মানুষজন আসে, কেউ একজন আমাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে, বলে, “আহা! একসময় কী ছিল!” তারা বোঝে না, আমি শুধু ‘একসময় কী ছিলাম’ তা নই। আমি তাদের হারানো ছন্দ, হারানো স্বাদ, হারানো সরলতার প্রতিচ্ছবি।
আমার এই নীরবতা এক দীর্ঘশ্বাস। এই কাঠ-দেহের প্রতিটি ফাটল ধরে যেন ফিসফিস করে প্রশ্ন করে: “তোমাদের এত আধুনিকতা, এত দ্রুতগতির জীবন… কিন্তু আমার কোলে বসে যে শান্তি খুঁজে পেতে, তা কি তোমরা ফিরে পেয়েছো?”
অপেক্ষায় থাকি, যদি কোনোদিন কোনো উৎসবে কেউ ভুল করেও আমার ওপর পা রাখে। হয়তো সেদিন আবারও মুন্সীগঞ্জের এই প্রান্তরের নিস্তব্ধতা ভেঙে উঠবে সেই হারানো সুর: ধুপ-ধাপ, ধুপ-ধাপ…





