​সাইড স্টোরি

আড়িয়াল বিলে ডগায় ডগায় নীরব কবিতা

একেকটি কোমড়ার ওজন হয় ছাড়ায় কয়েক মণে – সত্য প্রকাশ

​আড়িয়াল বিল। এটি কেবল একটি জলাভূমি নয়, এটি যেন শ্রীনগরের ইতিহাস আর প্রকৃতির এক সুবিশাল ক্যানভাস। বিলের বুকে যখন হালকা কুয়াশার চাদর পড়ে, তখন মনে হয় যেন কোনো শিল্পী তার তুলি দিয়ে বিলের জীবনযাত্রাকে মূর্ত করে তুলছেন। প্রতি বছর যেমন জল আসে, জল সরে যায়, তেমনি এই বিলের মাটিতে জন্ম নেয় এক সোনালী স্বপ্ন—সেটি হলো মিষ্টি কুমড়ো।

​কুমড়োর আবাদ এখানকার কৃষকদের কাছে শুধু চাষবাস নয়, এটি যেন বংশ পরম্পরায় বয়ে আসা একটি ঐতিহ্যবাহী গাঁথা। কার্তিকের শেষে যখন বিলের জল সরে গিয়ে পলির নরম মাটি বেরিয়ে আসে, সেই ভেজা গন্ধযুক্ত মাটির স্পর্শে কৃষকের আঙুলগুলো বীজ রোপণ করে। এই বীজ কেবল ফসলের বীজ নয়, তা যেন আগামী দিনের আশার বীজ।
​ডগায় ডগায় এক নীরব কবিতা
​এখন বিলজুড়ে কুমড়ো গাছেরা লতিয়ে উঠেছে, তাদের সবুজ পাতাগুলো সূর্যের আলো মেখে যেন ঝলমল করছে। আর এই ডগাগুলোতেই ঝুলে আছে সেই কাঙ্ক্ষিত ফল—সবুজাভ থেকে হলদে হয়ে ওঠা মিষ্টি কুমড়োগুলো। বাতাসের তালে তালে যখন কুমড়োগুলো মৃদু দুলতে থাকে, তখন মনে হয় যেন বিলের নীরবতা এক লতানো কবিতায় মুখর হয়ে উঠেছে।
​কুমড়োর এই পরিপূর্ণ রূপ যেন প্রকৃতির এক মমতাময়ী ইঙ্গিত। আড়িয়াল বিলের পলিমাটির বিশেষ গুণের কারণে এই কুমড়োগুলো মিষ্টি আর স্বাদে হয় অসাধারণ। কৃষিবিদরা বলেন, এই মাটি বিলের বুকে হাজার বছরের জল-জীবনের ইতিহাস ধারণ করে, আর সেই ইতিহাসই যেন ফলনের মাধ্যমে তার মাধুর্য বিতরণ করে।

​কৃষকের চোখে এখন শুধু একটাই প্রতীক্ষা—শীতের তীব্রতা বাড়ার। স্থানীয় কৃষকদের কথায়, বর্তমানে ফলন শুরু হলেও, প্রকৃতির নিয়ম মেনেই কুমড়োগুলোকে পুরোপুরি পরিপক্ব হতে আরও এক থেকে দেড় মাস সময় লাগবে। এই অপেক্ষার সময়টি যেন কৃষকের জীবনের এক বিশেষ পর্ব—যেমন করে কোনো শিল্পী তার সেরা সৃষ্টিকে পূর্ণতা দিতে সময় দেন, ঠিক তেমনি এই কুমড়োগুলোও পূর্ণ বিক্রির উপযোগী হওয়ার জন্য মাটির বুকে শক্তি সঞ্চয় করছে।
​এই অপেক্ষার পালা শেষ হবে যখন পৌষ-মাঘের কনকনে শীতে বিলের প্রতিটি কুমড়ো তাদের পরিপূর্ণ মিষ্টতা ও সোনালী আভা নিয়ে প্রস্তুত হবে। তখন এই বিলের কুমড়ো শুধু স্থানীয় বাজার নয়, বরং দেশের প্রতিটি প্রান্তে তার সুখ্যাতি নিয়ে ছড়িয়ে পড়বে। শ্রীনগরের এই আড়িয়াল বিলের মিষ্টি কুমড়ো যেন সেই গ্রামীণ জীবনধারার প্রতিচ্ছবি, যেখানে পরিশ্রম, ধৈর্য আর প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা মিলেমিশে তৈরি করে এক অমূল্য ফসল ও এক গভীর জীবনদর্শন।
​বিলের বুক থেকে এখন ভেসে আসছে শুধু ফসল ওঠার আগমনী বার্তা। এই বছর ভালো ফলনের আশায় কৃষকদের মুখে যে হাসি, তা যেন আড়িয়াল বিলের সোনালী রোদের মতোই উজ্জ্বল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button