বিক্রমপুরের নীরব কান্না

মুন্সীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদীর বুক চিরে যখন আধুনিকতার ঝলকানি এসে পড়ে, তখনো তার পাড়ের কাঁচা মাটির কুটিরে লুকিয়ে থাকে এক প্রাচীন ব্যথা—বাল্যবিবাহ আর নারী নির্যাতনের নীরব অভিশাপ। মুন্সীগঞ্জ—যা এককালে বিক্রমপুর নামে পরিচিত ছিল, বিদ্যার পীঠস্থান ও সমৃদ্ধির প্রতীক—আজও তার নারী ও শিশুদের কান্নায় ভারাক্রান্ত। অর্থনৈতিক অগ্রগতির চাকা দ্রুত ঘুরলেও, সমাজের মূল কাঠামোতে বাসা বেঁধে আছে এক গভীর ক্ষত, যা মানব হৃদয়ের সংবেদনশীলতাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
অসময়ের কুঁড়ি: বালিকা বধূদের মর্মগাথা
এই অঞ্চলে, জীবন যেন এক নির্মম ধাঁধা। যখন কিশোরীর হাতে থাকার কথা বই আর কাঁধের ব্যাগে স্বপ্ন, তখন তার হাতে তুলে দেওয়া হয় সংসারের চাবি, আর কোলে তুলে দেওয়া হয় অসময়ের মাতৃত্বের ভার।
”নিয়তির হাতে সঁপে দেওয়া এক টুকরো শাপলা ফুল যেন সে। জলের বুকে ফুটে ওঠার আগেই জোর করে ছিঁড়ে আনা হয়েছে, মাটির ভাঁড়ারের গভীরতায় যেখানে আলো পৌঁছায় না।”
দরিদ্রতা এখানে শুধু অভাব নয়, এটি মেয়েকে দ্রুত ‘দায়িত্বমুক্ত’ করার এক সামাজিক প্রেসক্রিপশন। বাবা-মায়ের চোখে—মেয়ে মানেই যেন এক প্রস্ফুটিত বিপদ, যা দ্রুত অন্য কারো হাতে তুলে দেওয়া প্রয়োজন। আইন এখানে কাগজে লেখা এক শুকনো অক্ষর, যা সামাজিক চাপের স্রোতে ভেসে যায়। কোভিডের সেই দিনগুলিতে, যখন স্কুলের ঘণ্টা নীরব হলো, তখন অনেক কিশোরীর জীবনে বেজে উঠল বিয়ের সানাই। সেই সানাইয়ের সুর তাদের কৈশোরের খেলার মাঠকে চিরতরে গ্রাস করে নিল।
মাতৃত্বের অভিশাপ: অপরিণত দেহে গর্ভধারণের ফল—উচ্চ মাতৃমৃত্যু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু আর ভগ্নপ্রায় মানসিক স্বাস্থ্য। তারা মা হয় না, হয় শুধু জীবনের শিকার। অসময়ের এই মাতৃত্ব, তাদের শিক্ষার অধিকার কেড়ে নেয়, তাদের আত্মবিশ্বাসের কফিন তৈরি করে। মুন্সীগঞ্জের এই বালিকা বধূরা যেন এক একটি ‘অসমাপ্ত কবিতা’, যা লেখার আগেই পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে।
সহিংসতার দহন: পারিবারিক চিতায় নারীর স্বপ্ন
ঘরের দেয়ালের ভেতরে যে নীরব সহিংসতা খেলা করে, তা বাইরের কোলাহল ভেদ করে শোনা যায় না। এটি শুধু শারীরিক আঘাত নয়, আত্মার ওপর প্রতিনিয়ত চলতে থাকা এক সূক্ষ্ম নিপীড়ন।
”ঘরের ভেতরটা তাদের জন্য নিছকই একটি আশ্রয় নয়, এটি তাদের আদালত, কারাগার এবং মাঝে মাঝে তাদের বধ্যভূমিও।”
এখনও যৌতুকের কালনাগিনী ফণা তোলে। স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির তুচ্ছ অজুহাতে শারীরিক প্রহার, মানসিক লাঞ্ছনা—এগুলো যেন এখানকার দাম্পত্য জীবনের এক করুণ অধ্যায়। লোকলজ্জার ভয়ে বেশিরভাগ নারী মুখ খোলেন না। তাদের মুখ যেন তালাবদ্ধ এক সিন্দুক, যেখানে হাজারো অপমান ও যন্ত্রণার দলিল লুকিয়ে আছে।
রাস্তায় শিকার, সমাজে নীরবতা: কর্মক্ষেত্রে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে ইভটিজিংয়ের শিকার হওয়া যেন এক অলিখিত নিয়ম। সেই টিটকারিতে মেয়েটি শুধু অপদস্থ হয় না, বরং সমাজের চোখে সে নিজেই যেন ‘দোষী’ হয়ে ওঠে। ফলস্বরূপ, অনেক মেয়ের শিক্ষার আলো নিভে যায়। আর যখন কেউ আইনি আশ্রয় নিতে চায়, তখন আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা, সাক্ষীর অভাব আর সমাজের ‘আপোষ করার’ চাপ তাকে আবার নীরবতার কোণে ঠেলে দেয়। অপরাধীরা পার পেয়ে যায়, আর ন্যায়বিচারের ধারণাটি মুন্সীগঞ্জের আকাশে এক মরীচিকা হয়ে ঝুলে থাকে।
মুন্সীগঞ্জের সামাজিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার জন্য এই নীরব অভিশাপের শেকল ভাঙা জরুরি। এই সমস্যাগুলি জিডিপি-র শুকনো পরিসংখ্যান নয়, বরং মানব উন্নয়নের মেরুদণ্ডকে ভেঙে দেয়।
”আমাদের জেগে উঠতে হবে। নয়তো, সভ্যতার এই প্রদীপে নারী ও শিশুদের কান্নায় ভিজে যাওয়া সলতে কোনোদিন আলো ছড়াবে না।”
শুধু আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং বিচার ব্যবস্থার সংবেদনশীলতা। পুলিশ, স্থানীয় প্রশাসন এবং বিচারকদের হতে হবে মানবিক ঢাল। সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো ‘সচেতনতার মশাল’ জ্বালানো। ধর্মীয় নেতা, শিক্ষকমণ্ডলী এবং স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা যখন বাল্যবিবাহ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলবেন, তখনই সামাজিক পরিবর্তনের ঢেউ উঠবে।
মেয়েদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলতে হবে। বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ ও কাজের সুযোগ তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা দেবে। একজন অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নারী সহজেই তার অধিকারের জন্য আওয়াজ তুলতে পারে।
নির্যাতিত নারীদের জন্য চিকিৎসা, আইনি ও মানসিক সহায়তার জন্য প্রতিটি উপজেলায় জরুরি সহায়তা কেন্দ্র (Crisis Center) স্থাপন করা আজ সময়ের দাবি। দ্রুত তথ্য সংগ্রহ ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করবে যে, এই ‘বিক্রমপুরের নীরব কান্না’ যেন আর কোনোদিন অন্ধকারে লুকিয়ে না থাকে।
মুন্সীগঞ্জকে কেবল অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হলেই চলবে না, সামাজিক ও নৈতিকভাবেও তাকে উন্নত হতে হবে। বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতনমুক্ত একটি সমাজই কেবল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সত্যিকারের সমৃদ্ধ বিক্রমপুর গড়ে তুলতে পারে।








