মুন্সীগঞ্জে বেকারত্বের বিষ : তারুণ্যের পথে অন্ধকার

যেখানে বর্তমানে এক গভীর সামাজিক সংকট দানা বাঁধছে। এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে জেলার শিক্ষিত ও কর্মহীন তরুণ প্রজন্ম, যারা একদিকে যেমন কর্মসংস্থানহীনতার শিকার, অন্যদিকে তেমনি মাদকাসক্তির আগ্রাসী থাবায় বিপথে চালিত হচ্ছে। হতাশা, বেকারত্ব আর মাদকের ত্রিমুখী আক্রমণে জেলার ভবিষ্যৎ আজ হুমকির মুখে।
প্রতি বছর মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করতে প্রস্তুত হয়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে শিল্পকারখানা ও বিনিয়োগের অভাব এবং সরকারি উদ্যোগে নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টির ব্যর্থতা এই তরুণদের ঠেলে দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্বের দিকে।
জেলায় সরকারের পক্ষ থেকে আধুনিক ও বাজার-চাহিদাভিত্তিক কারিগরি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অপ্রতুল। ফলে প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিতরা চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়া সত্ত্বেও মুন্সীগঞ্জে স্থানীয় উদ্যোক্তা বা সরকারের বড় ধরনের কোনো শিল্প-জোন বা অর্থনৈতিক করিডোর সেভাবে গড়ে ওঠেনি, যা বিপুল সংখ্যক কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারত।
দেখা যাচ্ছে যখন একজন শিক্ষিত তরুণ দীর্ঘ সময় ধরে চাকরি খুঁজে ব্যর্থ হয়, তখন তার মধ্যে মানসিক হতাশা এবং পরিচয় সংকটের সৃষ্টি হয়। এই হতাশা থেকেই এক শ্রেণির তরুণরা সহজলভ্য মাদকের দিকে ঝুঁকছে। ইয়াবা, গাঁজা এবং ফেনসিডিলের মতো মাদকদ্রব্য এখন মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় প্রায় খোলাখুলি বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
মনোবিদেরা বলছেন, “বেকারত্ব একটি মানসিক রোগ তৈরি করে। মুন্সীগঞ্জের তরুণদের মধ্যে যে হতাশা আমরা দেখছি, তা মূলত ব্যর্থতার ভয় এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা থেকে জন্ম নেওয়া। মাদক তখন তাদের কাছে এই বাস্তবতা থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পাওয়ার একটি সহজ কিন্তু ভয়ানক পথ।”
বলতে হয় শুধু অভিযান যথেষ্ট নয়। মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ ও প্রশাসন মাঝে মাঝে সক্রিয় হলেও, তা মাদকের উৎস বা এর চাহিদাকে পুরোপুরি নির্মূল করতে পারছে না।
কেননা মুন্সীগঞ্জে মাদকাসক্তদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র নেই। ফলে যারা একবার মাদকের ফাঁদে পড়ে, তাদের সুস্থ জীবনে ফেরার পথ কঠিন হয়ে যায়। সরকারিভাবে কিছু যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, সেগুলো বেশিরভাগই গতানুগতিক এবং বর্তমান বাজারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। এই প্রশিক্ষণগুলো যুবকদের আত্মনির্ভরশীল করতে পারছে না।
ফলে এর সমাধান করতে হলে তারুণ্যে বিনিয়োগ বাড়ালে মুন্সীগঞ্জের এই সংকট নিরসনে দ্রুত ফল আসতে পারে।
দ্রুত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে শিল্প পার্ক বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরি করা।
তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, এবং আধুনিক কৃষিনির্ভর শিল্পে বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
ছয়টি উপজেলাতেই পর্যায়ে মাদকাসক্তদের জন্য বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সেবার ব্যবস্থা করতে হবে।
এছাড়া খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং স্বেচ্ছাসেবী কাজে তরুণদের যুক্ত করে তাদের হতাশা দূর করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
মুন্সীগঞ্জের তারুণ্যই জেলার আসল শক্তি। এই শক্তিকে নেতিবাচক দিক থেকে ফিরিয়ে এনে গঠনমূলক কাজে লাগানোর জন্য এখনই সুদূরপ্রসারী সরকারি উদ্যোগ এবং ব্যাপক সামাজিক সচেতনতা প্রয়োজন।






