গজারিয়ায় রতনের ধানের শীষের সোনালি ঢেউ

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া, একদা যা কেবল তার উর্বর কৃষিজমি আর কৌশলগত অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল, শনিবারের এক বিকেলে যেন সেজে উঠেছিল এক অভূতপূর্ব উৎসবের সাজে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে সেদিন যে জনস্রোত নেমেছিল, তাকে কেবল মিছিল বললে ভুল হবে; এ ছিল যেন মেঘনা নদীর জোয়ার, যা মানব রূপে তীরে আছড়ে পড়ছিল। ডিসেম্বরের উজ্জ্বল রোদকে ছাপিয়ে, ধানের শীষের প্রতীককে কেন্দ্র করে হাজারো মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছিল একটিই নাম—কামরুজ্জামান রতন।
দূর থেকে দেখলে মনে হচ্ছিল, মাঠের সোনালি ধান নয়, বরং মানুষের মাথার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক আবেগঘন সোনালি তরঙ্গ। প্রতিটি মুখ, প্রতিটি কণ্ঠস্বর—সবকিছু মিলেমিশে তৈরি করেছিল এক অভিন্ন সিম্ফনি, যার মূর্ছনায় ছিল দীর্ঘদিনের সুখ-দুঃখ-আশা-স্বপ্ন আর পরিবর্তনের অদম্য আকাঙ্ক্ষা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, গজারিয়ার মেঘনা পাড়ের জনপদ ততই উত্তপ্ত হচ্ছে। কিন্তু এই উত্তাপ কেবল রাজনীতির নয়, বরং জনতার স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ থেকে উৎসারিত। গজারিয়া উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে দলে দলে মানুষ গতকাল মহাসড়কে নেমে এসেছিল—ট্রাকে, মোটরসাইকেলে, বা নিছক পায়ে হেঁটে।
এই মিছিলে নারী-পুরুষের উপস্থিতি ছিল সমান চোখে পড়ার মতো। কারোর হাতে ছিল ব্যানার, কারোর মুখে পরিবর্তনের নির্ভীক স্লোগান, আবার কেউবা নীরবে হেঁটে যাচ্ছিলেন হৃদয়ে লালন করা আশাটুকু নিয়ে। মহাসড়ক সেদিন আর শুধু যানবাহন চলাচলের পথ ছিল না; তা পরিণত হয়েছিল গজারিয়ার গণ-স্পন্দনে, যেখানে মানুষের বিশ্বাসের ধ্বনি রতনের নামে এক সুরে মিলেছিল।
উচ্চারিত স্লোগান: “ধানের শীষ চাই… রতন ভাই চাই…” “গজারিয়া জাগে, পরিবর্তনের পথে…”
স্লোগানের এই ঢেউ কখনও যুবকদের তেজোদীপ্ত কণ্ঠে, কখনওবা প্রবীণদের দৃঢ় উচ্চারণে উত্তাল হয়ে উঠছিল। সাদাসিধে লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা কৃষক থেকে শুরু করে কলেজপড়ুয়া তরুণ—সকলেই শনিবার একই ছন্দে বাঁধা পড়েছিলেন। স্থানীয় জনতা মনে করে, রতনের প্রতি এই আস্থা হঠাৎ সৃষ্টি হয়নি; এলাকার সুখ-দুঃখে পাশে থাকা, সমাজসেবা ও রাজনৈতিক পরিপক্কতার ফসল হিসেবেই তিনি আজ ‘ভরসার নাম’।
ভেতরের পথেও উৎসবের আমেজ
প্রধান মহাসড়ক ছাড়াও গজারিয়ার অভ্যন্তরীণ সড়কগুলোও ছিল উৎসবমুখর। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়ার মোড় পর্যন্ত আলোচনা একটাই: এবারের নির্বাচন গজারিয়ার জন্য নতুন ইতিহাসের জন্ম দেবে কিনা?
বয়স্করা হাত নেড়ে আশীর্বাদ করছিলেন, শিশু-কিশোরেরা ছুটে এসে কৌতূহল মেটাচ্ছিল। বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ সেদিন কেবল একটি রাজনৈতিক চিহ্ন ছিল না, ছিল মানুষের অটল আকাঙ্ক্ষার প্রতিরূপ।
জনতার এই বিশাল ঢল (অন্তত ১০ হাজার মানুষের উপস্থিতি) স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছিল: মেঘনা পাড়ের এই জনপদ এবার আর চুপ করে নেই। তারা কথা বলছে মিছিলের ভাষায়, জনসমুদ্রের ঢেউয়ে। সেদিনকার জমায়েত কেবল নির্বাচনী প্রদর্শনী ছিল না, ছিল মানুষের বহুদিনের জমে থাকা প্রত্যাশার বিস্ফোরণ।
শেষ দৃশ্যে এক ঐতিহাসিক তৃপ্তি
বিকেলের আলোয় যখন জনস্রোত ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে, তখনও বাতাসে ভেসে আসছিল স্লোগানের রেশ। রাস্তার ধুলোয়, ক্লান্ত অথচ তৃপ্ত মানুষের মুখে, যানজটের মাঝে—সবখানেই ছিল এক ধরনের ঐতিহাসিক মুহূর্তের ছাপ। যেন তারা প্রত্যেকেই পরিবর্তনের এক নতুন অধ্যায়ে নিজেদের অংশ করে নিয়েছে।
গজারিয়ার মানুষ দেখিয়ে দিয়েছে, নির্বাচন কেবল ভোটের নাম নয়; এটি মানুষের উচ্ছ্বাস, উল্লাস ও প্রত্যাশারও নাম। আর সেই উচ্ছ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে—ধানের শীষ এবং জনতার আস্থার নাম—কামরুজ্জামান রতন।








