মুন্সীগঞ্জ-৩: মনোনয়ন ঘিরে বিএনপির দুই ঘরে আবেগ, সংঘাত ও পুত্তলিকা দাহ

রাজনৈতিক অঙ্গন চিরকালই নাটকীয়তার মঞ্চ। আর সেই মঞ্চে এখন নতুন এক উত্তেজনার পারদ চড়ছে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে, যেখানে বহুল প্রতীক্ষিত ধানের শীষের প্রতীক এখন শোভা পাচ্ছে কামরুজ্জামান রতনের হাতে। এই একটি সিদ্ধান্তের রেশ ধরে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে জেলা জুড়ে চলছে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির এক আবেগঘন স্রোত, যা স্থানীয় রাজনীতির মানচিত্রকে নতুন করে সাজিয়ে তুলেছে।
দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কণ্ঠে যখন এই মনোনয়নপ্রাপ্তির ঘোষণা আসে, তখন মুন্সীগঞ্জ সদর ও গজারিয়া উপজেলার রাজনৈতিক আকাশ যেন নতুন করে সরগরম হয়ে ওঠে। একদিকে আনন্দ-উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে গভীর ক্ষোভ ও বিতৃষ্ণা—এই দুই বিপরীতমুখী স্রোতে বিভক্ত হয়ে পড়ে স্থানীয় বিএনপি।
সংঘাতের আগুন: ক্ষুব্ধ অনুসারীদের বিক্ষোভ, মশাল মিছিল ও পুত্তলিকা দাহ
জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মহিউদ্দিন আহমেদের অনুসারীদের হৃদয়ে এই মনোনয়ন যেন এক তীব্র আঘাত হেনেছে। তাদের কাছে এই সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই মেনে নেওয়ার মতো নয়। তাদের তীব্র অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে অভূতপূর্ব সংঘাতের মাধ্যমে:
টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ: শহরের বুকে টায়ার জ্বালিয়ে যে বিক্ষোভের আগুন তারা দেখিয়েছে, তা ছিল তাদের তীব্র অসন্তোষের প্রতিচ্ছবি। মুহুর্মুহু স্লোগানে তারা মনোনয়ন পুনঃবিচারের দাবি জানিয়েছে, প্রতিটি ধ্বনিতে মিশে ছিল তাদের আবেগ ও হতাশা।
ির্জা ফখরুলের পুত্তলিকা দাহ: ক্ষোভের মাত্রা এত তীব্র ছিল যে, মহিউদ্দিন আহমেদের অনুসারীরা দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সরাসরি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের পুত্তলিকা দাহ করে। এটি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের এক চরম উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
মশাল মিছিল: মনোনয়ন পরিবর্তনের দাবিতে তারা মশাল মিছিল করে রাজপথে নেমে আসে। মশাল মিছিলের আগুন যেন স্থানীয় বিএনপির ভেতরের জ্বলন্ত অসন্তোষেরই প্রতীক।
মিরকাদিম পৌরসভায় প্রতিবাদ: প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়েছে মিরকাদিম পৌরসভাতেও। সেখানেও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে, যেখানে কামরুজ্জামান রতনের মনোনয়নকে ‘অবৈধ’ দাবি করে অনুসারীরা তাদের জোরালো কণ্ঠস্বর তুলেছে।
রাজনীতির মাঠে নিদারুণ প্রত্যাখ্যানের এই দৃশ্য একদিকে যেমন নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যের বার্তা দিয়েছে, তেমনই তুলে ধরেছে দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি তাদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া।
আবেগের স্রোত: দোয়া মাহফিল ও নেত্রীর আরোগ্য কামনা
অন্যদিকে, কামরুজ্জামান রতন সমর্থকেরা এই বিজয়কে ‘আল্লার আশীর্বাদ’ হিসেবে দেখছেন। তাদের নেতার মনোনয়ন প্রাপ্তি যেন তাদের হৃদয়ে আশার আলো জ্বালিয়েছে। তাই মিরকাদিম ও গজারিয়ায় তারা আয়োজন করেছেন বিশেষ দোয়ার মজলিশ।
বিজয় ও আরোগ্যের মোনাজাত: এই দোয়া শুধু তাদের নেতার সাফল্যের জন্য নয়, বরং দলের প্রধান বেগম খালেদা জিয়ার আরোগ্য কামনায় হয়েছে বিশেষ মোনাজাত। প্রতিটি মোনাজাতে ঝরেছে নেত্রীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও আনুগত্যের অশ্রু।
এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির রাজনীতিকে এক অস্থির ও সংবেদনশীল মুহূর্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এই মনোনয়ন একদিকে যেমন দলীয় বিভাজনকে স্পষ্ট করেছে, অন্যদিকে তেমনি দেখিয়েছে কর্মী-সমর্থকদের গভীর আবেগ। এখন দেখার বিষয়, এই আলোড়ন ও আবেগ শেষ পর্যন্ত রাজনীতির ময়দানে কোন নতুন গল্প রচনা করে এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই অভ্যন্তরীণ সংঘাত সামাল দিতে কী পদক্ষেপ নেয়।


