মুন্সীগঞ্জে মাদক: বিষাক্ত বাতাসের পদধ্বনি

বিক্রমপুরের মাটি কেবল আলু বা ঐতিহ্যবাহী ফসলের জন্যই উর্বর নয়, এ মাটির প্রতি ভাঁজে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের সভ্যতা ও সমৃদ্ধির ইতিকথা। মেঘনা আর পদ্মার জলধৌত এই জনপদটি একসময় ছিল বাঙালির অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক হৃৎপিণ্ড। কিন্তু, আজ পদ্মা আর মেঘনা তীরের এই পবিত্র বাতাসে যেন মিশেছে এক অদৃশ্য বিষ, যা নীরবে গ্রাস করছে মুন্সীগঞ্জের ১৭ লক্ষ মানুষের আশা-স্বপ্ন। জেলার ভৌগোলিক সুবিধা, বিশেষত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রবেশদ্বার হওয়াএবং নদীবাহিত যোগাযোগ, যা একসময় আশীর্বাদ ছিল, আজ তা মাদকের ভয়াল স্রোতের প্রধান করিডোর হয়ে উঠেছে। মুন্সীগঞ্জ এখন কেবল একটি ট্রানজিট পয়েন্ট নয়, এটি মাদকাসক্তির এক সয়লাব জেলা, যেখানে সোনালী ফসলের মাঠে মাদকের কালো ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
সয়লাবের চিত্র: অদৃশ্য স্রোতের নাম ‘ইয়াবা’
গবেষণামূলক তথ্যানুসারে, মুন্সীগঞ্জে মাদকের প্রবাহ মূলত দু’টি প্রধান ধারায় বিভক্ত: ইয়াবা (Yaba) এবং ফেনসিডিল (Phensedyl)।
ইয়াবার মারণ ছোবল: জেলার তরুণ ও যুব সমাজের মধ্যে ইয়াবার প্রভাব সবচেয়ে বেশি। সড়ক ও নৌপথ ব্যবহার করে চট্টগ্রাম ও পার্শ্ববর্তী সীমান্ত এলাকা থেকে এই প্রাণঘাতী ট্যাবলেট দ্রুততম সময়ে মুন্সীগঞ্জের হাটে-বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে। এর আকর্ষণীয় রং ও সহজলভ্যতা, সঙ্গে চড়া দাম, স্থানীয় যুবকদের একদিকে যেমন নেশাগ্রস্ত করছে, তেমনি অন্যদিকে তাদের দ্রুত অর্থ উপার্জনের হাতছানি দিয়ে বাহকে পরিণত করছে। এটি এখন আর শুধু শহরের সমস্যা নয়, গ্রামের ঘরে ঘরে এর অন্ধকার মায়া ছড়িয়ে পড়েছে।
ফেনসিডিল ও গাঁজা: নদীতীরবর্তী এলাকাগুলো, বিশেষ করে গজারিয়া ও টঙ্গিবাড়ির কিছু অংশ, সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে আসা ফেনসিডিলের (মাদক হিসেবে ব্যবহৃত কফ সিরাপ) সহজ প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সস্তা ও সহজলভ্য গাঁজাও গ্রামাঞ্চলে নীরব ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জের এই মাদক সয়লাবকে যদি এক বিশাল জলরাশি হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে জেলার প্রতিটি সংযোগ সড়ক ও নদীবন্দর হলো সেই জলের প্রধান প্রবেশমুখ, যেখানে নিরাপত্তার ছিদ্রগুলো গলে প্রবেশ করছে মরণ নেশা।
মাদক কারবারী: অশুভ শক্তির অদৃশ্য জাল
এই মাদক স্রোতের মূল চালিকাশক্তি হলো কিছু স্থানীয় গডফাদার ও তাদের দ্বারা পরিচালিত অদৃশ্য নেটওয়ার্ক।
* সিন্ডিকেট কাঠামো:
মাদক কারবারীরা অত্যন্ত সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কাজ করে। এই সিন্ডিকেটগুলো স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোয় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করে, যাতে তাদের কার্যকলাপ নির্বিঘ্নে চলতে পারে। অনেক সময় এই কারবারীদের কেউ কেউ রাজনীতির আঁধারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজেদের এক অলঙ্ঘনীয় দুর্গে পরিণত করে।
* ক্ষুদ্র বাহক ও শিকার তরুণ:
এই সিন্ডিকেটের নিচের স্তরে থাকে জেলার অসংখ্য বেকার ও দারিদ্র্যপীড়িত তরুণ-তরুণী। দ্রুত অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ঝুঁকি নিয়ে মাদক পরিবহনে বাধ্য করা হয়। এভাবে এক একটি তরুণ জীবন কেবল আসক্তিতেই নয়, আইনের জালে এবং অপরাধের চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
* অর্থনৈতিক বিষচক্র:
মাদকের এই ব্যবসা জেলার অর্থনীতির কিছু অংশে একটি বিষাক্ত সমান্তরাল স্রোত তৈরি করেছে। এই কালো টাকা স্থানীয় সমাজে অস্থিরতা, চাঁদাবাজি এবং চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
* সমাজের ক্ষয়:
নীরব কান্না ও ভবিষ্যতের অন্ধকার
এই মাদকাসক্তি কেবল একটি ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটি মুন্সীগঞ্জের সামাজিক মেরুদণ্ডে আঘাত হানছে।
পারিবারিক ভাঙন: আসক্ত সন্তানের কারণে পরিবারগুলোতে নিত্য কলহ, অর্থ সংকট এবং সামাজিক সম্মানহানি এখন এক সাধারণ দৃশ্য। মাদকের প্রভাবে বহু পরিবার ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, মায়েদের নীরব কান্না হয়ে উঠছে প্রতিদিনের সাথী।
তরুণ প্রজন্মের পতন: যে তরুণ সমাজ দেশের ভবিষ্যৎ, শিক্ষা-সংস্কৃতির বাহক—তারা আজ এই নেশার কবলে পড়ে মেধা, স্বপ্ন ও সৃজনশীলতা হারাচ্ছে। একটি জেলার মানবসম্পদ বিকাশের পথে এটি সবচেয়ে বড় বাধা।
আইন-শৃঙ্খলার অবনতি: মাদক সেবনের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি এবং তুচ্ছ কারণে সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে। এক কথায়, মুন্সীগঞ্জের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন মাদকের প্রত্যক্ষ প্রভাবের শিকার।
প্রত্যাবর্তনের আহ্বান: শিকড়ের সন্ধানে
মুন্সীগঞ্জের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং উর্বর মাটি এই বিষাক্ত স্রোতকে মেনে নিতে পারে না। এই মাদকের সয়লাব থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত, গবেষণাধর্মী ও মানবিক উদ্যোগ।
১. আইনি কঠোরতা: মাদক কারবারী ও গডফাদারদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
২. পুনর্বাসন ও সচেতনতা: শুধুমাত্র গ্রেফতার নয়, মাদকাসক্তদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কার্যকর পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করা এবং তরুণদের মধ্যে মাদকের ভয়াবহতা নিয়ে লাগাতার সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো।
বিকল্প কর্মসংস্থান: বেকার যুবকদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা, যাতে তারা অর্থ উপার্জনের জন্য মাদকের মতো অন্ধকার পথে পা না বাড়ায়।
বিক্রমপুরের মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ, প্রশাসনের কঠোরতা এবং সমাজের মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে আলো ঝলমলে মেঘনা ও পদ্মার তীরের এই বিষাদ কালো দূর করে আবারও শান্তি ও সমৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে।








