সদর-গজারিয়া: রতনের অগ্নিপথ

মুন্সীগঞ্জের রাজনীতিতে মুন্সীগঞ্জ-৩ (সদর ও গজারিয়া) আসনটি যেন এক রহস্যময় ধাঁধা। জেলার তিনটি আসনের মধ্যে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—শুধু ভোটার সংখ্যার জন্য নয়, বরং এর রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে। এই আসনটি এখন বিএনপির ঘরের ভেতরেই এক চরম পরীক্ষার সম্মুখীন। মনোনীত প্রার্থীর জন্য এটি এখন কেবল নির্বাচনী লড়াই নয়, বরং নিজের দলের ‘ঘর’ গোছানোর এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা।
সদর: প্রতিরোধের দুর্ভেদ্য প্রাচীর
বিএনপি থেকে মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকে মুন্সীগঞ্জ সদরের চিত্রটি সম্পূর্ণই আন্দোলনমুখী। মনোনয়ন বঞ্চিত মহিউদ্দিন আহমেদ-এর অনুসারীরা দিনের পর দিন যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছেন, তা সদর উপজেলায় একটি ‘প্রতিরোধের দুর্ভেদ্য প্রাচীর’ তৈরি করেছে।
এই প্রতিরোধের কারণে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কামরুজ্জামান রতন এখন পর্যন্ত সদর উপজেলায় প্রবেশ করে কার্যকরভাবে অবস্থান বা প্রচার কাজ শুরু করতে পারেননি। এই পরিস্থিতি রতনের জন্য একটি গভীর রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি:
উপমা: “রাজার মুকুট থাকলেও রাজ্য থাকে যদি অন্যের দখলে, তবে সে রাজা নামে মাত্র।”— রতন দলীয় প্রতীক পেয়েও, আসনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থাৎ সদর উপজেলায় এখনো নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।
গজারিয়ার আশ্রয়, সদরের দূরত্ব
রতন কেবল তার জন্মস্থান গজারিয়া উপজেলাতেই তার ‘শো ডাউন’ বা জনসমাবেশ দেখাতে পেরেছেন। গজারিয়া হয়তো তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা দিচ্ছে, কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই আসনটির দুই-তৃতীয়াংশ ভোটার বাস করে সদর উপজেলায়। গজারিয়ার সমর্থন সমুদ্রে এক ফোঁটা জলের মতো স্বস্তি দিলেও, সদরের এই অনৈক্য ও প্রতিরোধ তাকে জয়ের বন্দর থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সদরের ভোটারদের কাছে টানতে না পারলে এই আসনে বিজয় অর্জন করা এক প্রকার ‘অসম্ভব স্বপ্ন’।
সদরের নেতা কর্মীরা যখন ক্ষোভে ফুঁসছে, তখন তাদের এই ক্ষোভ হয়তো ভোটের বাক্সে চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। মনোনয়ন বঞ্চিতদের এই আন্দোলন যদি শেষ পর্যন্ত ‘নিষ্ক্রিয়তা’ বা ‘নিরব বয়কটে’ রূপান্তরিত হয়, তবে রতনের জন্য গজারিয়ার সমর্থনও যথেষ্ট হবে না।
সময়ের মূল্য: নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই রতনের হাতে সদর উপজেলা গুছিয়ে নেওয়ার সময় কমে আসছে। এই আসনে জয়ের প্রথম শর্ত হলো সদর উপজেলার তৃণমূল ও বঞ্চিত নেতাদের সঙ্গে দ্রুত সমঝোতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।
রতন কি পারবেন সদর গুছাতে?
মুন্সীগঞ্জবাসী এখন এক শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্যের সাক্ষী। কামরুজ্জামান রতনের সামনে এখন এক বিশাল চ্যালেঞ্জ: বাকি দিনগুলোতে তিনি কী পারবেন এই বিভক্ত সদর উপজেলাকে গুছিয়ে ঐক্যবদ্ধ করতে?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে তিনটি মৌলিক বিষয়ে:
১. কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ: দলীয় হাই-কমান্ড কি মহিউদ্দিনের সমর্থকদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে কোনো কার্যকর ও আবেগঘন পদক্ষেপ নেবে?
২. ব্যক্তিগত উদ্যোগ: রতন কি তার নিজ উদ্যোগে মহিউদ্দিনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসে, মাঠের কর্মীদের সম্মান দিয়ে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে পারবেন?
৩. আবেগের বাঁধন: সদরের কর্মীদের দীর্ঘদিনের আবেগ ও দাবিকে সম্মান দেখিয়ে রতন কি তাদের মনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারবেন?
যদি এই তিনটি শর্ত পূরণ না হয়, তবে মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনটি বিএনপির জন্য ‘হাত ফসকে যাওয়া সোনার হরিণে’ পরিণত হতে পারে। রতনের এই অগ্নিপরীক্ষার ফলের দিকেই এখন তাকিয়ে আছে জেলার সকল রাজনৈতিক মহল।






