আগুনে আটকানো ক্ষোভের সেতু
মোক্তারপুরের বিকেল—যেখানে আগুন শুধু কাঠ জ্বালায় না, জ্বালায় রাজনীতির গভীর অসন্তোষও।
ঢাকা–নারায়ণগঞ্জের প্রবেশদ্বার মোক্তারপুর সেতু শুক্রবার বিকেলে রূপ নিল ক্ষোভের মঞ্চে। দিন তখন গড়িয়েছে সাড়ে তিনটার দিকে। হঠাৎই চারদিক থেকে মানুষের ঢল নেমে আসে সেতুর বুকে। সাধারণত যেখানে গাড়ির চাকা ছুটে চলে ঘণ্টায় শত শতবার, সেখানেই থমকে দাঁড়ায় সবকিছু। উড়তে থাকা ধুলোর ওপর ছড়িয়ে পড়তে থাকে আন্দোলনের গরম নিশ্বাস।
এরপরেই ফেটে পড়ে আগুন। চওড়া কাঠ, শুকনো বাঁশ, ছেঁড়া কাগজ—সবই একসময়ে মিশে যায় ধূসর ধোঁয়ার বিস্তীর্ণ চাদরে। জ্বলে ওঠা শিখাগুলো কেবল কাঠের নয়; যেন জ্বলে উঠেছে রাজনৈতিক অভিমানের অন্তর্লীন অসন্তোষ।
বিক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে একটি নাম—মহিউদ্দিন আহমেদ,মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির সদস্য সচিব। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে কেন্দ্রীয় নির্বাচন মনোনয়ন তাকে না দিয়ে দেওয়া হয়েছে বিএনপির কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ সম্পাদক কামরুজ্জামান রতনকে। এমন ঘোষণার পর মুহূর্তেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে মহিউদ্দিনের সমর্থকেরা।
তাদের কণ্ঠে তখন একটাই আকুতি— মনোনয়ন মানিনা। কেন এই মনোনয়ন?
আর এ প্রশ্নের জবাব চেয়ে তারা সেতু অবরোধে নামে। সাড়ে তিনটা থেকে বিকাল পাঁচটা—পুরো দেড় ঘণ্টা মোক্তারপুর সেতু পরিণত হয় চলন্ত জনজীবনের গলায় বাঁধা শক্ত বেণীতে—অচল, উদ্ভ্রান্ত, অনিশ্চিত।
সেতুর দুই প্রান্তে তখন গাড়ির সারি, মাঝখানে ছাই উড়ছে বাতাসে। পথযাত্রীরা হতভম্ব। কেউ হাঁটছেন, কেউ দাঁড়িয়ে দেখছেন—আগুনের লেলিহান শিখা কিভাবে কাঠের গায়ে আঁচড় কাটছে। শিশুরা দূর থেকে তাকিয়ে, কেউ কেউ আতঙ্কে মায়ের আঁচল আঁকড়ে আছে। হঠাৎই দাউ দাউ করে উঠা আগুনের দিকে ছুটে আসে কিছু মানুষ—প্রতীকী ক্রোধ ছুড়ে দিতে।
এই আগুন কেবল প্রতিবাদের নয়; এটি গভীর বিভাজনের আগুনও। একই দলের ভেতরের টানাপোড়েন কতটা তীব্র হলে সড়ক পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেয়—তার এক উন্মুক্ত প্রমাণ যেন সেই জ্বলন্ত সেতু।
রাতের আঁধারে মশালের মিছিল
দিন শেষ হয়নি এখানেই। বৃহস্পতিবার রাত, তারপর শুক্রবার—টানা দুই রাতজুড়ে মশাল মিছিল করেছে মহিউদ্দিন সমর্থকরা। আলো নয়, বরং সেই মশালের আগুনে ফুটে ওঠে ক্ষোভের অগ্নিভাষা। রাতের অন্ধকারে ভাসমান লাল শিখাগুলো শহরের দেয়ালে ছায়ার মতো রেখে যাচ্ছিল অস্থিরতার দগদগে দাগ।
সেসব মিছিল যেন বলছিল— “মনোনয়ন বদলাতে হবে, না হলে আগুনের শিখা আরও উঁচু হবে।”
জেলা শহরের রাস্তাও পুড়ছে—পুড়ছে জনজীবনের স্বাভাবিকতা।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে শহরের সড়কেও দেখা মিলেছে পোড়া কাঠের গন্ধ, কালো ধোঁয়ার চিহ্ন। রাজনীতির তীব্র অভিমান সাধারণ মানুষের পথঘাটকেও নিরাপদ রাখতে পারছে না। আটকে পড়া যাত্রী, তড়িঘড়ি থেমে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্স, স্কুলছুট বাচ্চাদের উদ্বিগ্ন মুখ—সবকিছু মিলিয়ে একটি অস্থির ছবির জন্ম দিচ্ছে।
মনোনয়ন ঝড়ে ক্ষতবিক্ষত দলীয় মাঠ।
বিক্ষোভকারীরা বিশ্বাস করেন— মনোনয়ন যদি পরিবর্তন হতো, তাহলে ধানের শীষ জয়ী হতো।
কিন্তু এই দাবির উত্তাপ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে দলের ভেতরে। রাজনীতি, যা মানুষের জন্য পথ তৈরি করার কথা—সেই রাজনীতিই যদি পথ বন্ধ করে দেয় আগুনের প্রতিবন্ধকে, তবে সাধারণ মানুষের নীরব প্রশ্ন আরও জোরালো হয়।
সেতুর ওপর রেখে যাওয়া ছাই—একটি দিনের নয়, একটি সময়ের প্রতীক
আগুন নিভে গেছে, মানুষের ভিড় সরে গেছে, সেতুর পথ আবার চলাচলের জন্য খুলে গেছে— কিন্তু ছাইয়ের স্তূপ এখনো পড়ে রয়েছে। সে ছাইয়ের প্রতিটি দানা যেন সাক্ষ্য দিচ্ছে— “রাজনীতির বিভাজন যখন খুব গভীরে জন্ম নেয়, তখন তার আগুন নিভলেও তার গন্ধ থেকে যায় অনেকদিন।”
মোক্তারপুর সেতুর সেই বিকেল তাই শুধু বিক্ষোভের ঘটনা নয়; এটি একটি জনপদের রাজনৈতিক যন্ত্রণার প্রকাশ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের স্পষ্ট চিহ্ন, এবং সামনে আসা সময়ের অস্থিরতার আভাস।







