আড়িয়াল বিলের পলি মাটির জাদু মিষ্টি কুমড়া

শ্রীনগরের ঐতিহাসিক আড়িয়াল বিলের বিস্তীর্ণ জলপথ ও পললভূমিতে এখন এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের সমাহার। কৃষকের স্বপ্ন আর প্রকৃতির আশীর্বাদে ভরে উঠেছে বিলের প্রতিটি কণা—ডগায় ডগায় দুলছে সবুজাভ-হলদে মিষ্টি কুমড়ো, যা দেখে মনে হয় যেন বিলের বুক জুড়ে হলুদ রঙের আলপনা আঁকা হয়েছে। এই দৃশ্য যেন শুধু একটি ফসলের নয়, বরং মুন্সীগঞ্জের কৃষকদের অদম্য পরিশ্রম আর মাটির উর্বরতার এক জীবন্ত কাব্য।
আড়িয়াল বিলের পলিমাটির জাদু
আড়িয়াল বিলের মিষ্টি কুমড়োর এই সমারোহের মূলে রয়েছে এখানকার পলিমাটির বিশেষ গুণাগুণ। প্রতি বছর বন্যার স্রোতে ভেসে আসা পলিমাটি এই বিলের জমিকে এমন এক উর্বরতা দেয়, যা দেশের অন্য অঞ্চলের মাটি থেকে একে আলাদা করে তুলেছে। কৃষিবিদ ও ব্যবসায়ীরা একমত যে, এই মাটির বিশেষত্বের কারণেই আড়িয়াল বিলের মিষ্টি কুমড়োর স্বাদ, মিষ্টতা ও মান দেশের বাজারে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে প্রতিষ্ঠিত। এই কুমড়ো শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটায় না, এর সুনাম এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং বাজারে এর চাহিদা সব সময়ই থাকে শীর্ষে।
আড়িয়াল বিল অঞ্চলে মিষ্টি কুমড়োর আবাদ একটি নির্দিষ্ট ঋতুভিত্তিক চক্র অনুসরণ করে।
রোপণের সময় (অক্টোবর-নভেম্বর): সাধারণত বর্ষা শেষের দিকে, যখন বিলের জল নামতে শুরু করে এবং জমিতে পলিমাটি জমতে থাকে, তখন কৃষকরা কার্তিক মাসের শেষ দিক থেকে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিকে এই কুমড়োর বীজ রোপণ করেন। এটাই মূলত শীতকালীন কুমড়োর আবাদ।
ফলন ও সংগ্রহ (জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি): চারা রোপণের প্রায় দুই থেকে আড়াই মাস পর কুমড়োয় ফলন আসতে শুরু করে। বর্তমানে বিলের ক্ষেতগুলোতে যে কুমড়ো দেখা যাচ্ছে, তা কেবল ফলন শুরু হয়েছে। স্থানীয় কৃষকদের বক্তব্য অনুসারে, যখন শীতের তীব্রতা আরও বাড়বে, অর্থাৎ পৌষ ও মাঘ মাস (জানুয়ারি থেকে মধ্য ফেব্রুয়ারি), তখনই কুমড়োগুলো পুরোপুরি পরিপক্ব এবং বিক্রির জন্য সম্পূর্ণ উপযোগী হয়ে উঠবে। এই সময়েই কৃষকরা তাদের সোনালী ফসল ঘরে তোলেন।
শ্রীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ বিন সাদেক নিশ্চিত করেছেন যে এই বছর মিষ্টি কুমড়োর ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে এবং কৃষি বিভাগ নিয়মিতভাবে ফসলের খোঁজ-খবর রাখছে। ফলন ভালো হওয়ায় স্থানীয় কৃষকদের চোখে এখন ভবিষ্যতের লাভের হাতছানি।
এক কৃষক যেমন বলেছেন, “আল্লাহর রহমতে এবার ফলন খুব ভালো। কুমড়োগুলো কেবল বড় হচ্ছে, যার আকার হয় তিন মণ পর্যন্ত। পুরোপুরি পাকতে আরও এক থেকে দের মাস সময় লাগবে। আমরা আশা করছি, এই বছরের ফলন থেকে আমরা গতবারের চেয়েও বেশি লাভবান হতে পারব।” তাদের এই প্রত্যাশা শুধু ভালো ফলনের উপর নয়, বরং আড়িয়াল বিলের মিষ্টি কুমড়োর অবিসংবাদী গুণমান ও বাজারের উচ্চ চাহিদার উপর ভিত্তি করে।
আড়িয়াল বিলের মিষ্টি কুমড়ো কেবল একটি ফসল নয়—এটি মুন্সীগঞ্জের কৃষি অর্থনীতির মেরুদণ্ড এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক মধুর প্রতিচ্ছবি। শীতকাল যতই কাছে আসছে, ততই কৃষকের চোখে আশা আর মুখে উপকূলীয় মিষ্টি হাসি ফুটে উঠছে, যে হাসি এই বিলের মিষ্টি কুমড়োর মতোই অমলিন।








