“রাতের আগুন, ভোরের নীরবতা”

গনকপাড়ার সেই রাতটা আজও বাতাসে ভাসে। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছিল নিস্তব্ধভাবে, কিন্তু মানুষের উত্তেজনা নয়। রাস্তায় মানুষের ঢল, চোখেমুখে ক্ষোভ—আর ঘরের জানালাগুলো নিঃশব্দে কেঁপে ওঠে তাদের হাঁকডাকে।
ঘটনার সূচনা ছিল ভোরের আলোয়, কিন্তু বিস্ফোরণ ঘটল গভীর রাতে। মানুষের আবেগ, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা আর ভয়—সব মিলিয়ে যেন এক ধরনের উন্মাদ স্রোত বয়ে গেল গনকপাড়ার বুক দিয়ে। শহরের আলো তখনও জ্বলছিল, কিন্তু মানুষের চোখে ছিল আগুনের মতো রোষ।
যুবকের বাড়িটি ছিল অন্ধকারে ডুবে থাকা এক ছোট্ট কাঠামো। দিনের বেলা যেটি সাধারণ ঘর, রাতে সেটি হয়ে উঠল এক অস্থির ভিড়ের লক্ষ্যবস্তু। লাঠি, ইটের টুকরা, চিৎকার—সবকিছু মিলিয়ে যেন এক গভীর অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি। দরজা-জানালার ভাঙাচোরা শব্দ মাঝরাতের আকাশে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসছিল— “এভাবে কেন হলো?” “কী সত্য? কী মিথ্যা?”
কিন্তু সেই মুহূর্তে কেউ আর তা ভাবেনি। মানুষের ক্ষোভ যখন মাথায় চেপে বসে, তখন যুক্তির মূল্য থাকে না।
পুলিশ এল, এরপর সেনাবাহিনী। টর্চলাইটের আলো কাঁপছিল মানুষের মুখে, কেউ উদ্বিগ্ন, কেউ ক্ষুব্ধ, কেউ ভীত। সেনাদের দৃপ্ত পায়ের শব্দে যেন পুরো এলাকা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হচ্ছে। অবশেষে আটক হলো যুবক, আর তাকে ছিঁড়ে ফেলতে উদ্যত জনতার হাত থেকে বাঁচিয়ে আনা হলো তার বাবাকে।
কেউ বলল— “ছেলেটা নেশাগ্রস্ত, মাথা ঠিক নেই।” কেউ বলল— “অপরাধ তো অপরাধ।” কেউ আবার দরজা বন্ধ করে শুধু আঁধারের দিকে তাকিয়ে রইল— মানুষের আচরণ আর বিশ্বাসের সংঘাতে জন্ম নেওয়া ভয় তাকে থমকে দিল।
রাত শেষে ভোর এল। ভাঙা কাঁচের ওপর আলো পড়ে ঝলমল করে উঠল। রাস্তার মোড়ে দুই-তিনজন বসে ঘটনার গল্প করছে, আর দূরে পুলিশ টহল দিচ্ছে। রাতের আগুন নিভে গেছে, কিন্তু সবার মনে রয়ে গেছে কালো ছাই— একটি ঘটনা কত সহজে পুরো সমাজকে কাঁপিয়ে দিতে পারে, তার জীবন্ত উদাহরণ।
গনকপাড়ার সকালের বাতাসে এখনো থমথমে নীরবতা। মনে হচ্ছে যেন পুরো এলাকা একটাই কথা বলছে— “রোষের আগুন যত দ্রুত জ্বলে ওঠে, তার ধোঁয়া তত দীর্ঘ সময় ধরে মনকে ঢেকে রাখে।”



