আঁধারে জ্বলে মশাল: মুন্সীগঞ্জের ক্ষোভের আগুন

মুন্সীগঞ্জের জনপদ এখন যেন এক বিয়োগান্তক নাটকের মঞ্চ। সন্ধ্যা নামলেই শীতের কুয়াশা ভেদ করে শহরের রাজপথে জ্বলে উঠছে এক ভিন্ন ধরনের আলো— মশাল মিছিলের আলো। এই আলো কোনো উৎসবের বার্তা বহন করে না, এ হলো টানা নয় দিনের তীব্র ক্ষোভের প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ। ধানের শীষের প্রতীকের প্রত্যাশী, মনোনয়ন বঞ্চিত মহিউদ্দিন আহমেদ-এর অনুসারীরা যেন আঁধার রাতে হাতে মশাল নিয়ে বেরিয়েছেন, নিজেদের দাবি ও আক্ষেপকে আলোকিত করতে।
মশাল মিছিল: প্রতিবাদের এক কাব্য
রাজনীতিতে মশাল কোনো সাধারণ প্রদীপ নয়; এটি হলো আন্দোলন, বিদ্রোহ ও ন্যায়ের প্রতীক। যখন কোনো পক্ষ মনে করে তাদের দাবি ন্যায্য হওয়া সত্ত্বেও উপেক্ষিত, তখন তারা এই আদিম অগ্নিশিখাকে হাতে তুলে নেয়। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের মহিউদ্দিন-সমর্থকেরা এই মশাল মিছিলে যেন তাদের বার্তা দিচ্ছে:
”আলো ফেলেছি পথে, কিন্তু পথ দেখছেনা কেউ।”
প্রতি সন্ধ্যায় শহরের বিভিন্ন সড়কে এই মশাল মিছিল ঘুরছে। এই মিছিলগুলি কেবল পদযাত্রা নয়, এগুলো যেন এক একটি ‘রাজনৈতিক গাথা’— যেখানে স্লোগানের তীব্রতা, মশাল থেকে নির্গত ধোঁয়া এবং কর্মীদের চোখে-মুখে জমে থাকা হতাশা, সবই এক গভীর আবেগের জন্ম দিচ্ছে। তাদের ক্ষোভের মূল সুর: দলীয় সিদ্ধান্ত মাঠের বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।
মশাল জ্বালিয়ে তারা হয়তো বোঝাতে চাইছেন যে, অন্ধকারে ডুবে যাওয়া এই দলীয় সিদ্ধান্তের উপর তারা আলো ফেলতে চান। তারা মনে করছেন, মহিউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বই এই আসনে জয়ের একমাত্র আলো। সেই আলোকে উপেক্ষা করার ফল হবে অন্ধকার।
এই মশাল মিছিল কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের উপর একটি তীব্র মানসিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করছে। এটি নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে যে, তৃণমূলকে দূরে রেখে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তা সফল হবে না। এই আন্দোলনের আগুন যদি নির্বাচনে ভোট বাক্স পর্যন্ত পৌঁছায়, তবে তার ফল হবে মারাত্মক।
মনোনয়ন বঞ্চিতদের এই আন্দোলনের মূল কারণ হলো, তারা রতনকে নয়, মহিউদ্দিনকেই বিজয়ী প্রার্থী হিসেবে দেখেন। তাদের কাছে, মহিউদ্দিন কেবল একজন নেতা নন, তিনি তৃণমূলের আত্মবিশ্বাস। বছরের পর বছর ধরে তারা মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে লড়াই করেছে।
তাদের ভাষ্যমতে, যখন প্রতিপক্ষ দুর্বল তখন জয় নিশ্চিত করতে প্রয়োজন এমন একজন নেতা যিনি মাটির গন্ধ বোঝেন। মহিউদ্দিনের জন্য তাদের আবেগ এতটাই তীব্র যে, তারা একে ‘অস্তিত্বের লড়াই’ হিসেবে দেখছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: বিএনপির মতো একটি দলের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল ‘শৃঙ্খলার ঐক্য’। কিন্তু মশাল মিছিল প্রমাণ করছে যে, সেই শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। এই আন্দোলনের কারণে মহিউদ্দিনের সমর্থকেরা যদি ভোটের দিন কেন্দ্রে না আসেন বা নিষ্ক্রিয় থাকেন, তবে তা জয়ের সম্ভাবনাকে ‘অন্ধকারের অতলে’ নিয়ে যাবে। অভ্যন্তরীণ ক্ষোভের এই বহিঃপ্রকাশ ভোটের অঙ্কে এক বিশাল ‘শূন্য’ তৈরি করবে, যা অন্য কোনো প্রার্থী বা ফ্যাক্টর দিয়ে পূরণ করা সম্ভব হবে না।
মুন্সীগঞ্জের বাতাস এখন মশাল মিছিলের ধোঁয়ায় ভারী। এই ক্ষোভের আগুনকে নেভাতে দলীয় হাই-কমান্ড কী পদক্ষেপ নেয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। অন্যথায়, এই আন্দোলন মুন্সীগঞ্জের ইতিহাসে বিএনপির জন্য এক চরম বিয়োগগাথার জন্ম দিতে পারে।






