আমাদের মুন্সিগঞ্জ​সাইড স্টোরিসারা বাংলা

শহীদ জি সি দেব: মুক্তবুদ্ধির বলিদান

মুন্সীগঞ্জ (তৎকালীন বিক্রমপুর) জেলার লাউসার গ্রামের পবিত্র ভূমিতে জন্ম নিয়েছিলেন এক ক্ষণজন্মা মনীষী, ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, যিনি সংক্ষেপে জি সি দেব নামেই পরিচিত। তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশের দর্শন চিন্তার এক প্রবাদপুরুষ। তাঁর পাণ্ডিত্য কেবল বইয়ের পাতায় বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর জীবনদর্শন ছিল ‘অখন্ড মানবতা’-র প্রতি নিবেদিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সব মানুষ এক এবং সব দর্শনের মূল সুর একই।
​এই মহামানব তাঁর জীবন, দর্শন এবং শেষ পর্যন্ত রক্ত দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, সত্য ও মানবতা তাঁর কাছে জাগতিক জীবনের চেয়েও অনেক মূল্যবান ছিল।

​ড. জি সি দেব শুধু একজন শিক্ষক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সমন্বয়ী সাধক। তাঁর দর্শন ছিল পূর্ব ও পশ্চিমের চিন্তা, ধর্ম ও বিজ্ঞান, ভাববাদ ও বস্তুবাদ—সবকিছুর এক অপূর্ব মেলবন্ধন। তিনি তাঁর কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন যে, পৃথিবীর সব জ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে, যা মানুষকে বিভেদ নয়, ঐক্যের পথে চালিত করে।
​তিনি তাঁর লেখনী ও শিক্ষাদান প্রক্রিয়ায় সর্বদা শান্তি ও অহিংসার বার্তা ছড়িয়ে দিতেন। এই মহান দার্শনিক বিশ্বাস করতেন, “জ্ঞানই মুক্তি, মানবতাই ধর্ম।” তাঁর এই উদার, মানবতাবাদী দর্শনই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে এক শ্রদ্ধার পাত্রে পরিণত করেছিল।
​​১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ, কালরাতে যখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে ঢাকা শহরে নিরীহ মানুষের ওপর গণহত্যা শুরু করে, তখন তাদের অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরা। অধ্যাপক জি সি দেব তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের আবাসিক শিক্ষক এবং প্রভোস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
​তিনি চাইলেই আত্মগোপন করতে পারতেন, কিংবা দেশ ত্যাগ করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর অখন্ড মানবতার প্রতি অবিচল বিশ্বাস তাঁকে পালাতে দেয়নি। তিনি মনে করতেন, তিনি কোনো ভুল করেননি, তাই ভয় কিসের? তিনি হলের নিজের কক্ষেই ছিলেন, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দর্শন ও মানবতাকে আঁকড়ে ধরে।
​সেই বিভীষিকাময় রাতে, ঘাতক সেনারা জগন্নাথ হলে প্রবেশ করে। তাঁর ছাত্র এবং ঘনিষ্ঠ সহচরদের সামনেই তারা তাঁকে খুঁজে বের করে।

​ড. জি সি দেবকে যখন তাঁর কক্ষ থেকে টেনে হিঁচড়ে বের করা হয়, তখন তাঁর বয়স প্রায় ৬৪ বছর। জীবনের শেষ মুহূর্তেও তাঁর চোখে কোনো ভয় ছিল না, ছিল কেবল গভীর বেদনা ও মানবজাতির প্রতি সীমাহীন করুণা।
​জানা যায়, জগন্নাথ হলের করিডোরেই তাঁকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়। শুধু তাঁকে নয়, সেই রাতে আরও অনেক শিক্ষক, ছাত্র এবং কর্মচারীকেও হত্যা করা হয়েছিল। জি সি দেবের রক্ত সেই রাতে জগন্নাথ হলের পবিত্র মাটিকে সিক্ত করেছিল, যা ছিল মুক্তবুদ্ধি এবং মানবতার প্রতি হানাদার বাহিনীর চরম আঘাতের প্রতীক।
​তাঁর আত্মত্যাগ কেবল একজন শিক্ষকের মৃত্যু ছিল না; এটি ছিল সহাবস্থান, সহিষ্ণুতা এবং বিশ্বজনীন মানবতাবাদের দর্শনের প্রতি এক নিষ্ঠুর আঘাত।

​শহীদ অধ্যাপক জি সি দেবের পার্থিব জীবন শেষ হলেও, তাঁর দর্শন এবং আত্মত্যাগ আজও বাঙালির চেতনায় চিরন্তন অনুপ্রেরণা। মুন্সীগঞ্জের এই কৃতি সন্তানের জীবন আমাদের শেখায় যে, আদর্শের কাছে কোনো আপস চলে না এবং সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করাও মহৎ কাজ।
​তাঁর ‘অখন্ড মানবতা’র বার্তা আজও আমাদের জাতীয় জীবনে সম্প্রীতি ও ঐক্যের পথ দেখায়। তাঁর আত্মবলিদান বুদ্ধিজীবী হত্যার সেই কালো অধ্যায়কে স্মরণ করিয়ে দেয়, যখন একটি জাতি তাঁর সবচেয়ে আলোকিত সন্তানদের হারিয়েছিল। মুন্সীগঞ্জ তাঁর এই মহান সন্তানকে নিয়ে চিরকাল গর্বিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button