আমাদের মুন্সিগঞ্জসারা বাংলা

​মেঘনার বুকে দস্যু-সম্রাট

যেখানে আইনের চেয়ে হুলিয়াই শক্তিশালী
​মুন্সীগঞ্জের গজারিয়াপাড়ের গুয়াগাছিয়া—মেঘনা নদীর স্রোত আর সবুজ বেতবন দিয়ে ঘেরা একটি জনপদ। এককালে এই শান্ত ভূমি তার নিজস্ব ঐতিহ্য আর সরলতার জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু আজ, এই জনপদের বাতাস ভিন্ন এক আতঙ্ক আর হতাশায় ভারি। কারণ, এখানকার নিরঙ্কুশ শাসনভার এখন হাতে তুলে নিয়েছে পিয়াস নামের এক দুর্ধর্ষ যুবক—যার কাছে আইনের বইয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বন্দুকের নল আর কোমরে গোঁজা ধারালো ছুরি। স্থানীয়দের কাছে সে কেবলই এক দস্যু নয়, সে যেন ‘মেঘনা বেষ্টিত গুয়াগাছিয়ার সম্রাট’।
​ সম্রাটের ঔদ্ধত্য: ডজন ডজন মামলা, শত শত বুলেট
​পিয়াসের অতীত বা বর্তমান জীবন কোনো সাধারণ মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি নয়। তার নামের পাশে লেগে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ অভিযোগ, ডজন ডজন মামলা আর অগণিত হুলিয়া। এই সংখ্যাগুলো তার কাছে কোনো দুর্বলতা নয়, বরং তার ‘ক্ষমতা’ এবং ‘অস্পৃশ্যতার’ শংসাপত্র। প্রকাশ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে তার বাহিনী অসংখ্য গুলি ছুঁড়েছে, পুলিশের ক্যাম্প লক্ষ্য করে হয়েছে শত শত ককটেল বিস্ফোরণ। এই সাহস তার আসে তার ক্ষমতার উৎস থেকে—যা তাকে বিশ্বাস যোগায় যে সে আইনের ঊর্ধ্বে।
​”পুলিশকে লক্ষ্য করে শত শত ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে তাতে কি? তবুও সেতো সম্রাটই।”—এই বাক্যটি যেন কেবল পিয়াসের অহংকার নয়, এটি এই জনপদের চরম হতাশাজনক বাস্তবতা।
​ হানাদার মুক্ত দিবসে দখলী উৎসব
​ঔদ্ধত্য যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন তা পরিহাসের রূপ নেয়। গত ১১ ডিসেম্বর ছিল মুন্সীগঞ্জ জেলা হানাদার মুক্ত দিবস—একদিকে যখন প্রশাসন ও সাধারণ মানুষ স্বাধীনতা এবং মুক্তির আনন্দ উদযাপন করছে, ঠিক তখনই ঢাক-ঢোল বাজিয়ে নিজের সশস্ত্র দস্যুবাহিনী নিয়ে গুয়াগাছিয়ায় প্রবেশ করে এই ‘দস্যু-সম্রাট’ পিয়াস। যেন সে প্রমাণ করতে চেয়েছিল, পুরনো হানাদাররা চলে গেলেও নতুন এক প্রকার ‘হানাদার’ এখানে স্থায়ীভাবে শিকড় গেড়েছে।
​রাতে গুয়াগাছিয়ায় শুরু হয় তাণ্ডব। একনাগাড়ে চলে ডাকাতি, মারধর ও ভয়ভীতি প্রদর্শন। কারো ঘরে প্রবেশ করে সরাসরি লুঠপাট, আবার কাউকে ধরে এনে মারধর করে ডাকাতির নাটক সাজানো হয়। ভুক্তভোগী মানুষের আর্তনাদ নদীর ঢেউয়ের শব্দের মতোই রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।
​প্রশাসনের অসহায় আত্মসমর্পণ?
​স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের বাঁচাতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে বারবার যোগাযোগ করে। কিন্তু সেই যোগাযোগ ব্যর্থতার এক মর্মান্তিক দলিল হয়ে দাঁড়ায়। একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা স্থানীয় এক নারী সাদিয়াকে বলেন, তাদের মাত্র বিশজন পুলিশ সদস্য নিয়ে পিয়াস বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করে আহত হওয়ার ঝুঁকি নিতে চান না।
​এই মন্তব্য শুধু একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত বক্তব্য নয়, এটি যেন সামগ্রিক প্রশাসনের একরকম ‘অসহায়ত্বের পরিচয়’। পিয়াস হয়তো এটাই চেয়েছিল—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই ‘সমীহ’ তার সাম্রাজ্যের ভিত্তি আরও মজবুত করে। “সাবাশ পিয়াস সাবাশ”—এই নির্মম উক্তিটি পিয়াসের কাছে যেমন সাফল্যের প্রতীক, তেমনি গুয়াগাছিয়াবাসীর কাছে এটি সিস্টেমের পতন ও নৈরাজ্যের প্রতীক।
​ যৌথ অভিযানের ফাঁকি: যখন সম্রাট চলে গেলেন
​জনগণের ক্রমাগত চাপ এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবন করে অবশেষে ১২ তারিখ বিকেলে যৌথ অভিযান শুরু হয়। কিন্তু  প্রশাসন যখন অভিযানে নামে, তার অনেক আগেই দস্যু-সম্রাট পিয়াস সগৌরবে এবং নির্বিঘ্নে তার ‘নিরাপদ স্থানে’ সরে যান।
​এতে গুয়াগাছিয়াবাসীর মনে প্রশ্ন জাগে: যদি পিয়াসকে ধরতেই না পারা যায়, তবে এই যৌথ অভিযানের উদ্দেশ্য কী? যেখানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী এক ডজন মামলার আসামিকে ধরতে ব্যর্থ হয় এবং তাকে ‘মুক্ত দিবসে’ তাণ্ডব চালানোর সুযোগ দেয়, সেখানে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখাটা কি কেবলই এক অলীক কল্পনা?
​গুয়াগাছিয়া আজ মেঘনার স্রোতে ভাসমান এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ—যেখানে আইনের শাসন নয়, বরং বন্দুকের শাসনই আসল সত্যি। এই অন্ধকার দূর করতে কেবল অভিযান নয়, প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি স্তরে রাষ্ট্রের দৃঢ় উপস্থিতি এবং পিয়াস-সম্রাটের মতো সকল দুর্বৃত্তের প্রতি শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button