বিক্রমপুরে পলাশের রঙে চাঁদের মেলা

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান, এক ঐতিহাসিক জনপদ, শনিবার ৬ ডিসেম্বর হয়ে উঠেছিল মননশীলতার এক উৎসবভূমি। ধলেশ্বরী পাড়ের শান্ত প্রকৃতি যেন সেদিন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাহিত্য-সাধক এমদাদুল হক পলাশ-এর ৭০তম জন্মবার্ষিকী উদযাপনের সাক্ষী হতে মুখর হয়ে উঠেছিল। যে মানুষটি বিক্রমপুরের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনকে এক ছাদের নিচে আনতে ‘বিক্রমপুর চাঁদের হাট’-এর মতো সৃজনশীলতার বাতিঘর তৈরি করেছিলেন, তাঁর জন্মদিনে কাঁঠালতলী বিক্রমপুর চাঁদের হাট পাঠাগারের আঙিনা পরিণত হয়েছিল লেখক, কবি, শিক্ষক ও সাধারণ মানুষের এক নক্ষত্র-সমাবেশে।
এটি কেবল একটি জন্মদিন উদযাপন ছিল না; এটি ছিল এক স্বপ্নদ্রষ্টার প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অঞ্জলি। দীর্ঘদিনের কর্ম ও সাহিত্য-সাধনার প্রতিরূপ এমদাদুল হক পলাশ।
‘পলাশ কথা’: স্মারকগ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন
দিনের আয়োজনের কেন্দ্রে ছিল এমদাদুল হক পলাশ-এর লেখা স্মারকগ্রন্থ ‘পলাশ কথা’-র মোড়ক উন্মোচন। তাঁর চিন্তা, দর্শন এবং কর্মময় জীবনের প্রতিচ্ছবি এই গ্রন্থে যেন এক বিশেষ মহিমায় উদ্ভাসিত হলো।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মুহাম্মাদ জমির হোসেনের হাতে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয়। তাঁর উদ্বোধনী ভাষণে তিনি পলাশ-এর সাংবাদিকতা ও সাহিত্য-জীবনে সততা ও দেশপ্রেমের মূল্যবোধের উপর আলোকপাত করেন।
অনুষ্ঠানটির প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় ছিলেন উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব রমজান মাহমুদ এবং প্রগতি লেখক সংঘের মুন্সীগঞ্জ জেলা সভাপতি মুজিব রহমান। তাঁদের সাবলীল উপস্থাপনা উপস্থিত দর্শক ও শ্রোতাদের স্মৃতির সরণিতে আরও গভীরে নিয়ে যায়।
আলোচনা সভায় আলোর দিশারী
আলোচনা সভাটি হয়ে উঠেছিল বিক্রমপুরের বুদ্ধিজীবীদের মিলনমেলা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিক্রমপুর চাঁদের হাট সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মুফতী আহমেদ। তিনি পলাশ-এর সাংগঠনিক দক্ষতা ও সাংস্কৃতিক নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।
কেন্দ্রীয় চাঁদের হাটের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পারভেজ, উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক পিয়ার মোহাম্মদ এবং বিক্রমপুর কে বি কলেজের অধ্যক্ষ সুমন্ত্র রায়সহ অন্যান্য বক্তারা পলাশ-এর কর্মজীবন এবং বিক্রমপুর চাঁদের হাট প্রতিষ্ঠায় তাঁর দূরদর্শী ভূমিকার কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেন।
উপস্থিত কবি, লেখক, সাহিত্যিক, শিক্ষক, ইমাম ও ছাত্রসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ পলাশ-এর আদর্শ ও মানবিক মূল্যবোধ নিজেদের জীবনে ধারণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাঁদের বক্তব্যে বারে বারে উঠে আসে: এমদাদুল হক পলাশ কেবল একজন সাংবাদিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জাগরণের অন্যতম স্থপতি।
পরিশেষে দোয়ার মাহফিলে শান্তি ও কল্যাণ
আলোচনা সভার সমাপ্তি ঘটে এক আবেগঘন দোয়ার মাহফিলে। এই মাহফিলে এমদাদুল হক পলাশ-এর আত্মার শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা হয়। সাহিত্য ও মননের চর্চার পাশাপাশি, আধ্যাত্মিক শান্তির এই আয়োজন জন্মবার্ষিকীর দিনটিকে এক পূর্ণতা দান করে।
এই দিনটি মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে আবারও প্রমাণ করল যে, সাংবাদিকতা ও সৃজনশীলতার মাধ্যমে সমাজে আলো ছড়ানো মানুষেরা কর্মের মধ্য দিয়েই চিরঞ্জীব হয়ে থাকেন। এমদাদুল হক পলাশ-এর সেই ‘চাঁদের হাট’ ভবিষ্যতেও বিক্রমপুরের বুকে সাহিত্য-প্রেমীদের আশ্রয়স্থল হয়ে থাকবে—যেমনটা চাঁদ হয়ে থাকে রাতের আকাশের ধ্রুবতারা।






