মুন্সীগঞ্জে ঐতিহ্যবাহী ফল ও ফসলের বিলুপ্তি

বিক্রমপুর অঞ্চলটি কেবল তার উর্বর আলুর জন্যই বিখ্যাত ছিল না, বরং আবহাওয়া ও মাটির সঙ্গে মানানসই কিছু স্থানীয় জাতের ফল ও ফসলের জন্যেও এর ছিল এক বিশেষ পরিচিতি। এই ঐতিহ্যবাহী জাতগুলো ছিল পরিবেশবান্ধব, রোগপ্রতিরোধী এবং পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ। কিন্তু, গত কয়েক দশকে কৃষি পদ্ধতির পরিবর্তন, বাণিজ্যিকীকরণের চাপ এবং সরকারি উদ্যোগের অভাবে এই স্থানীয় কৃষি-বৈচিত্র্য আজ বিলুপ্তির পথে। এই বিলুপ্তি মুন্সীগঞ্জের ১৭ লক্ষ অধিবাসীর খাদ্য বৈচিত্র্য, অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব এবং স্থানীয় পরিবেশ-সহনশীলতার ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
কয়েকটি উদাহরণের মাধ্যমে তুলে ধরতে চাই,যে ঐতিহ্য বিলীন হচ্ছে
মুন্সীগঞ্জ থেকে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে এমন কিছু মূল্যবান স্থানীয় জাত:
বিক্রমপুরের ঐতিহ্যবাহী পেয়ারা: একসময় বিক্রমপুরের পেয়ারা তার স্বতন্ত্র স্বাদ ও গন্ধের জন্য বিখ্যাত ছিল। কিন্তু, উচ্চ ফলনশীল ও দ্রুত বর্ধনশীল সংকর (Hybrid) জাতের পেয়ারা চাষের কারণে স্থানীয় জাতের চারা ও বীজ সংরক্ষণ করা হয়নি। এখন সেই আদি পেয়ারার বাগানগুলি প্রায় বিলুপ্ত।
স্থানীয় জাতের আম: মুন্সীগঞ্জের কয়েকটি স্থানে স্থানীয় জাতের সুস্বাদু আম পাওয়া যেত, যা ছিল অঞ্চলের নিজস্ব সম্পদ। এখন প্রধানত বাণিজ্যিক ও বাজার-কেন্দ্রিক জাতের আগ্রাসন দেখা যাচ্ছে।
কলার ঐতিহ্য জাত : রামপালের সাগর আর সবরি কলার ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মও জানে। কিন্তু সে ঐতিহ্য আর নেই। এর পাশাপাশি দেশীয় সুস্বাদু কবরী কলাও ছিলো। বর্তমানে বাজার কেন্দ্রিক জাতের আগ্রাসনে সেদিকটার নজর সরিয়ে ফেলেছে কৃষকেরা।
আলুর ঐতিহ্যবাহী জাত: যদিও মুন্সীগঞ্জ আলু উৎপাদনের কেন্দ্র, তবুও স্থানীয়ভাবে অভিযোজিত আলুর কিছু ঐতিহ্যবাহী জাত ছিল (যেমন: সিঁদুরী আলু), যা মাটির রোগ বালাই প্রতিরোধে সক্ষম ছিল। এখন ফলন বৃদ্ধির চাপে কৃষকরা প্রধানত সংকর জাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন।
বিলুপ্তির কারণ: কিসের গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য?
এই ঐতিহ্যবাহী ফল ও ফসল বিলুপ্ত হওয়ার পেছনে প্রধানত নিম্নলিখিত কারণগুলো দায়ী:
সংকর জাতের আগ্রাসন: উচ্চ ফলনশীল (High Yielding Varieties – HYV) সংকর জাতের বীজ সহজলভ্য হওয়ায় এবং দ্রুত অর্থপ্রাপ্তির আশায় কৃষকরা ঐতিহ্যবাহী জাতের চাষাবাদ বন্ধ করে দিচ্ছেন। সংকর জাতগুলো বাজারজাতকরণে সহজ হলেও, সেগুলোর জন্য প্রচুর সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয়।
কৃষিজমির ব্যবহার পরিবর্তন: আবাসন প্রকল্প এবং ইটভাটার কারণে উর্বর কৃষিজমি নষ্ট হওয়ায় যে সামান্য জমি অবশিষ্ট থাকে, সেখানে কৃষক ঝুঁকি নিতে চান না এবং দ্রুত ফলন দেয় এমন জাত বেছে নেন।
সংরক্ষণের অভাব: স্থানীয় বা সরকারি পর্যায়ে এই জাতগুলোর বীজ বা চারা সংরক্ষণের জন্য কার্যকর বীজ ব্যাংক (Seed Bank) বা জিন পুল (Gene Pool) গড়ে ওঠেনি। ফলে একবার বিলুপ্ত হলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
জলবায়ু পরিবর্তন: কিছু স্থানীয় জাত নির্দিষ্ট আবহাওয়ার সাথে খাপ খায়। জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন আসায় এই জাতগুলো উৎপাদন কঠিন হয়ে পড়ছে।
এই কৃষি-বৈচিত্র্যের বিলুপ্তি মুন্সীগঞ্জের ১৭ লক্ষ অধিবাসী এবং পরিবেশের ওপর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে
স্থানীয় জাতগুলো দীর্ঘকাল ধরে বিক্রমপুরের জলবায়ু ও মাটির সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে ছিল। এগুলোর বিলুপ্তি মানে পরিবেশগত পরিবর্তন মোকাবিলার জন্য স্থানীয় কৃষি ব্যবস্থার প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া।
আর ঐতিহ্যবাহী ফল ও ফসলে যে পুষ্টি উপাদান ছিল, তা সংকর জাতে অনুপস্থিত থাকতে পারে। খাদ্যের বৈচিত্র্য কমে যাওয়ায় জনগণের পুষ্টি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।
এতে স্থানীয় জাতগুলো সংরক্ষণের মাধ্যমে জিআই (Geographical Indication) ট্যাগ পাওয়ার সম্ভাবনা থাকত, যা কৃষকদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি করত। সেই সম্ভাবনাও বিলীন হচ্ছে।
বিক্রমপুরের কৃষি ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। যেমন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে মুন্সীগঞ্জে স্থানীয় জাতের বীজ ও চারা সংরক্ষণের জন্য একটি শক্তিশালী বীজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা এবং কৃষকদের মধ্যে বিনামূল্যে তা বিতরণ করা।
স্থানীয় জাতগুলোর পুষ্টিগত মান এবং রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা নিয়ে কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে গবেষণা করা এবং সেগুলোর বাজারজাতকরণে সহায়তা করা।
এছাড়া ঐতিহ্যবাহী জাত চাষকারী কৃষকদের আর্থিক ভর্তুকি বা বিশেষ সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে তাদের উৎসাহিত করা। কৃষিজমি রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি বিলুপ্তপ্রায় জাতগুলো সংরক্ষণে বিশেষ আইনি কাঠামো তৈরি করা, যাতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান এর অপব্যবহার করতে না পারে।

