রাজনীতি

মুন্সীগঞ্জ-তিন: কোন্দলের পারদ কি পরাজয়ের সুর?

আসন ধরে রাখার প্রশ্নে অগ্নিপরীক্ষায় বিএনপি,বলছি –
মুন্সীগঞ্জ তিন  আসনে কামরুজ্জামান রতনের হাতে ধানের শীষের প্রতীক তুলে দেওয়ার পর বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গনে যে ‘আবেগ ও সংঘাতের’ ঢেউ উঠেছে, তা আসনটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে: এই চরম অভ্যন্তরীণ কোন্দল কি দলটির জন্য ভালো কিছু বয়ে আনবে, নাকি পরাজয়ের সুর বাজাবে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মনোনয়নকে ঘিরে এই ধরনের প্রকাশ্য বিদ্রোহ ও বিদ্রোহের অগ্নিশিখা ঐতিহাসিকভাবেই যেকোনো দলের জন্য ধ্বংসাত্মক প্রমাণিত হয়েছে।
​​রাজনীতির সাধারণ সূত্র হলো, দলের অভ্যন্তরীণ ঐক্যই নির্বাচনী বিজয়ের প্রধান চাবিকাঠি। মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে যা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল মতভেদ নয়, এটি হলো দলের মূল কাঠামোর মধ্যে গভীর ফাটল।
​ভোটের বিভাজন: মহিউদ্দিন আহমেদের অনুসারীরা যখন মশাল মিছিল, টায়ার জ্বালানো এবং পুত্তলিকা দাহের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করছে, তখন ধরেই নেওয়া যায় যে তারা মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে মাঠে নামবে না। এই বিশাল কর্মীগোষ্ঠীর নিষ্ক্রিয়তা বা, আরও খারাপভাবে, নীরব বিরোধিতা সরাসরি দলীয় ভোটবাক্সে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে, প্রতিটি ভোটের মূল্য যেখানে অপরিসীম, সেখানে এই বিভাজিত ভোট আসনটি আসন হারানোর সুর বাজানোর প্রধান কারণ হতে পারে।

মহিউদ্দিনের ​কর্মী-সমর্থকের হতাশা: কর্মীরা তাদের প্রত্যাশিত নেতাকে মনোনয়ন না দেওয়ায় যে হতাশা ও বিতৃষ্ণা সৃষ্টি হয়েছে, তা তৃণমূলের কর্মীদের মধ্যে উৎসাহ ও প্রেরণার অভাব তৈরি করবে। ফলস্বরূপ, নির্বাচনী প্রচারণায় ঐকান্তিকতা ও জোরালো অংশগ্রহণের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
​সুবিধাভোগী প্রতিপক্ষ: বিএনপির এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল প্রতিপক্ষ দল বা প্রার্থীর জন্য ‘আশীর্বাদ’ স্বরূপ। যখন একটি দল নিজেরাই নিজেদের শক্তিক্ষয় করে, তখন প্রতিপক্ষকে আসনটি ছিনিয়ে নিতে অতিরিক্ত বেগ পেতে হয় না। তারা সহজেই এই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে পারে।
​ সংকটের মধ্যেও আশার আলো: কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ভূমিকা
​তবে এই অস্থিরতার মধ্যেও একটি সুযোগের জানালা খোলা থাকতে পারে, যদি কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সঠিক সময়ে কৌশলগত পদক্ষেপ নিতে পারে।
​ক্ষোভ প্রশমনে উদ্যোগ: অবিলম্বে দলীয় মহাসচিব বা সিনিয়র নেতাদের মুন্সীগঞ্জে এসে বিক্ষোভকারী নেতা (মহিউদ্দিন আহমেদ) এবং কর্মীদের সাথে আবেগঘন সংলাপের মাধ্যমে তাদের ক্ষোভ প্রশমিত করতে হবে। বিদ্রোহী নেতাকে উপযুক্ত সম্মানজনক পদ বা আশ্বাস দিয়ে মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
​ঐক্য ফিরিয়ে আনার কৌশল: কামরুজ্জামান রতনের উচিত হবে তার জয়ের উল্লাসকে কিছুটা সংযত করে, মনোনয়নবঞ্চিত অংশের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তাদের নিয়েই নির্বাচনের মাঠে নামার ঐক্যবদ্ধ বার্তা দেওয়া। এই সংবেদনশীল আচরণ আবেগের পারদ কিছুটা কমাতে পারে।

​বড় লক্ষ্যের দিকে দৃষ্টি: কর্মীদের বোঝাতে হবে যে, ব্যক্তিগত আবেগ বা স্থানীয় স্বার্থের চেয়ে দলের বৃহত্তর লক্ষ্য (সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন বা নির্বাচনী জয়) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি
​মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনে বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা স্পষ্টতই বিএনপির জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা। একদিকের উল্লাস ও মোনাজাতের আবেগ অন্যদিকের বিক্ষোভ ও মশাল মিছিলের সংঘাতকে চাপা দিতে পারছে না।
​যদি এই কোন্দল দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিরসন করা না যায়, তবে আসনটিতে পরাজয়ের সুরই বেশি বাজবে। কারণ, রাজনীতির মাঠে বিভাজিত আবেগ কখনই সংগঠিত শক্তির বিকল্প হতে পারে না। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, মুন্সীগঞ্জ-৩-এর চূড়ান্ত ফল নির্ধারণে ভোটারদের সমর্থনের চেয়েও বেশি ভূমিকা রাখবে দলটির অভ্যন্তরীণ ঐক্য এবং সংহতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button