আমাদের মুন্সিগঞ্জসারা বাংলা

১১ ডিসেম্বর: আলোর মিছিলে মুন্সীগঞ্জ

সেই গৌরবোজ্জ্বল ১১ ডিসেম্বর
​ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ১১ ডিসেম্বর, ১৯৭১—এই দিনটিই ছিল মুন্সীগঞ্জবাসীর কাছে বহু প্রতীক্ষিত চূড়ান্ত মুক্তির দিন।
​যদিও ৯ ডিসেম্বরের দিকে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হানাদাররা পালাতে শুরু করেছিল, কিন্তু জেলা সদর ও মূল প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলো থেকে তাদের চূড়ান্ত বিতাড়ন ঘটে এই দিন। এদিন ভোরেই খবর ছড়িয়ে পড়ে যে, অবশিষ্ট পাকিস্তানি সেনারা জেলার প্রধান ঘাঁটিগুলো ছেড়ে ঢাকার দিকে পুরোপুরি সরে গেছে। মুন্সীগঞ্জের আপামর জনতা, যারা এতদিন ভয়ে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছিল, তারা যেন এক লহমায় বাঁধনমুক্ত হলো। শত শত মানুষ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিতে দিতে পথে নেমে আসে। সেই দিনের আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়েছিল বিজয়ের উল্লাসে, যা ছিল দীর্ঘদিনের চাপা কান্না আর প্রতিবাদের বহিঃপ্রকাশ।

​১১ ডিসেম্বরের দৃশ্যপট ছিল একইসঙ্গে আনন্দ এবং গভীর শোকের সংমিশ্রণ।
মুক্তিসেনারা বিজয়ের বেশে যখন মুন্সীগঞ্জ শহরের প্রধান সড়কে প্রবেশ করেন, তখন জনতা তাদের ফুল ছিটিয়ে, বরণ করে নেয়। সেই মুহূর্তে মুক্তিসেনাদের চোখে ছিল গর্ব, আর সাধারণ মানুষের চোখে ছিল কৃতজ্ঞতার অশ্রু।
মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয় এবং অন্যান্য সরকারি ভবনের চূড়ায় পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে যখন প্রিয় লাল-সবুজের পতাকা উত্তোলন করা হয়, সেই মুহূর্তটি ছিল মুন্সীগঞ্জবাসীর জীবনে এক গভীরতম আবেগঘন মুহূর্ত। পতাকার প্রতিটি রং যেন শহীদদের রক্ত আর প্রকৃতির সবুজকে ধারণ করে জানান দিচ্ছিল—”এই মাটি এখন আমাদের।”
আনন্দের এই দিনেও মানুষের মনে ছিল স্বজন হারানোর গভীর শোক। ১১ ডিসেম্বর বিকেলে, মানুষজন ফুলদী নদীর পাড় এবং হরগংগা কলেজের পূব পাশে ও অন্যান্য গণহত্যার স্থানগুলোর দিকে ছুটে যায়। বিজয়ের এই দিনে তারা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে শপথ নেয়—তাদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে দেবে না। আনন্দের মিছিলে মিশে ছিল শোকের নীরবতা, যা স্বাধীনতার মূল্যকে আরও বেশি মহিমান্বিত করেছিল।

​১১ ডিসেম্বর কেবল মুন্সীগঞ্জ জেলাকে মুক্ত করেনি; এটি মুন্সীগঞ্জবাসীর হৃদয়ে নতুন করে আশা ও স্বপ্ন জাগিয়েছিল। এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কেবল একটি তারিখ নয়, এটি প্রতিটি শহীদ, মুক্তিযোদ্ধা এবং অত্যাচারিত সাধারণ মানুষের সাহস, সংগ্রাম আর ত্যাগের সম্মিলিত ফল।
​আজও ১১ ডিসেম্বর এলে মুন্সীগঞ্জবাসী নতুন করে শপথ নেয়, যে দেশ লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে, সেই সোনার বাংলাকে তারা যেন মাথা উঁচু করে রাখতে পারে। মুন্সীগঞ্জ মুক্ত হয়েছিল; মুক্ত হয়েছিল বিক্রমপুরের মাটি, এবং শুরু হয়েছিল এক নতুন ভোরের যাত্রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button