মুন্সীগঞ্জের কৃতি সন্তান অভিনেতা নবদ্বীপ হালদার

বিশিষ্ট ভারতীয় বাঙালী বাংলা চলচ্চিত্রের অভিনেতা ও কৌতুক অভিনেতা নবদ্বীপ হালদার। তার অভিনয় অত্যন্ত সাবলীল ও নৈপুণ্যে ভরপুর। তিনি নিজের প্রতিভার কারিশমা দিয়ে দর্শকদের হৃদয়ে আনন্দের ফোয়ারা বইয়ে দিতেন।
নবদ্বীপ হালদার একজন ভারতীয় বাঙালী অভিনেতা ছিলেন৷ তিনি ১৯১১ সালের ২৫শে নভেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার সোনপলাশী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন৷
এদের আদিনিবাস ছিল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকার বিক্রমপুর অধুনা মুন্সিগঞ্জের বজ্রযোগনী গ্রামে। দেশভাগের বহু আগেই পেশার তাগিদে তার পরিবার পশ্চিম বঙ্গের বর্ধমান চলে আসে।
নবদ্বীপ হালদার বাংলা চলচ্চিত্রে আসেন ৩০ এর দশকে৷ মূলত কৌতুক অভিনেতা ছিলেন৷ নানা হাস্যরসপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি৷ এছাড়া অনেক শ্রুতিনাটকে কণ্ঠদান করেছেন৷ তার ভাঙা গলা ও অভিনয়ের কৌশল তাকে জনপ্রিয়তার শিখরে নিয়ে গিয়েছিল।
অ্যাক্টো করতে কলকাতা থেকে যাত্রাদলও চলে এসছে। কিন্তু মঞ্চে উঠে সংলাপটাই ভুলে গেলেন অভিনেতা নবদ্বীপ হালদার । “হাঁড়ি খুলে দেখি মাংস নেই”-এর পরিবর্তে তিনি বললেন, “হাঁড়ি খুলে দেখি, বাবা নেই।” ব্যাস!
এতেই কেল্লা ফতে। দর্শক পচা আলু ছোঁড়ার পরিবর্তে হো হো করে হাসতে শুরু করলো। পরে জানা গেল অভিনেতার সংলাপ ভুলে যাওয়ার বিষয়টা ইচ্ছাকৃত।
লোক হাসানোর জন্যই এমনটা করতেন স্বর্ণযুগের বাংলা সিনেমার অন্যতম গুণী কৌতুকাভিনেতা নবদ্বীপ হালদার। যাঁরা তাঁর ছবি দেখেছেন, অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছেন, তাঁদের কাছে নবদ্বীপ হালদার মানেই চওড়া হাসি সহ বিচিত্র কণ্ঠে বলে ওঠা— “বাবু, আমি চাকর মনিষ্যি।”
বাংলা চলচ্চিত্রের ‘স্বর্ণযুগ’। পর্দা কাঁপাচ্ছেন মহারথীরা। রুপোলি পর্দায় দেখা দিচ্ছেন যে সব ছায়াপুরুষ-ছায়া-মানবীরা, তাঁদের নখদর্পণে বিভিন্ন রকম চরিত্রে অভিনয়ের দক্ষতা।
এঁদের মধ্যে অনেকেই চিহ্নিত হয়ে রয়েছেন নিছক ‘কমেডিয়ান’ হিসেবে। নবদ্বীপ হালদার শুধু পর্দাতেই নয়, গ্রামোফোন রেকর্ডেও আসর মাতিয়েছেন এক কালে।
নবদ্বীপ হালদার এর বহুবিধ কণ্ঠে গাওয়া কৌতুকগীতি ‘আর খেতে পারিনে বাপু প্যান্তাফ্যাচাং তরকারি’ মধ্যবিত্ত বাঙালির দিনযাপনে আজও নির্মম সত্য।
তাঁর শ্রুতিনাটকগুলোর নামগুলোও বেশ মজার – যুদ্ধ বিভ্রাট, রসগোল্লায় ইঁদুর, ইনজেকসান বিভ্রাট, হুলো বেড়াল, আদালতে গড়গড়ি, যাত্রা বিভ্রাট, লুচি বিভ্রাট, মামা ভাগ্নে, পণ্ডিত মশাই।
১৯৪১ সাল। ব্রিটিশ আমল। সারা ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া জুড়ে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তুমুল ভাবে চলছে। বোমার ভয়ে কলকাতা ছেড়ে পিলপিল করে মানুষ পালাচ্ছে গ্রাম-গঞ্জের দিকে।
ঠিক সেই সময়ে ওয়ার ফান্ডে টাকা তোলার জন্যে তমলুক শহরের রাজবাড়ির ময়দানে এক বিরাট বিচিত্রানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল সরকারের তরফ থেকে।
তখনকার দিনে বিচিত্রানুষ্ঠান বলে কোনও শব্দের তখনও আমদানি হয়নি। ওটাকে বলা হত জলসা। সারা মেদিনীপুর জেলা জুড়ে সরকারের তরফে বড়ো বড়ো পোস্টার পড়েছিল ‘বিরাট জলসা’র।
এই জলসা আরও বিশেষ কারণ তমলুকের মানুষ তার আগে কোনও জলসা চাক্ষুস করেনি। সারা শহর একটা হইচই পড়ে গিয়েছিল। রাজবাড়ির মাঠে প্যান্ডেল বাঁধা দেখবার জন্যে দলে দলে মানুষ এসে ভিড় জমাত। তিনজন উর্দিপরা পুলিশ সেই ভিড় সামলাত।
জলসার টিকিটের দাম ধার্য হয়েছিল এক টাকা এবং দু টাকা। ওই দাম শুনে মানুষ চমকে উঠেছিল। তখন চালের দাম ছিল আড়াই টাকা থেকে তিনি টাকা মণ। এক মণ মানে চল্লিশ কেজি।
দুটো টাকায় একটা পরিবারের সারা মাসের দু’মুঠো ভাতের সংস্থান হয়ে যেত। সেই জলসায় গান গেয়েছিলেন পঙ্কজ মল্লিক আর শচীনদেব বর্মন। নেচেছিলেন অরুণা দাস আর শ্যামসুন্দর। কমিক করেন নবদ্বীপ হালদার।
সেই জলসায় নবদ্বীপ হালদার মঞ্চে উঠে কথা বলা শুরু করতে লোকজনের সন্দেহ হয় তিনিই আসল নবদ্বীপ কিনা। কারণ, পর্দায় বা রেকর্ডের গলার স্বরের সঙ্গে বাস্তবে তাঁর কণ্ঠস্বরের কোনও মিল ছিল না।
যদিও সেটাই ছিল নবদ্বীপ হালদার এর আসল কণ্ঠস্বর। কমিক করার সময় নিঁখুত বাচনভঙ্গিতে একাধিক চরিত্র রূপায়িত করতেন একার কণ্ঠস্বরের মধ্যে দিয়ে।
সেই সময় নবদ্বীপ হালদার একেবারে হট পপুলার। যাঁদের গ্রামোফোন ছিল তাঁদের প্রত্যেকের বাড়িতেই কাননবালা, পঙ্কজ মল্লিক, কানাকেষ্ট, সায়গল কিংবা যূথিকা রায়ের গানের রেকর্ডের সঙ্গে দু-চারটে নবদ্বীপ হালদারের কমিকের রেকর্ড অবশ্যই থাকত।
তখনকার দিনে একটা দিন ঠিক করে মফস্সল শহরে বিত্তবানদের বাড়িতে গ্রামোফোন কেনার আসর বসতো। সেসময়কার বিভিন্ন জনপ্রিয় রেকর্ড শোনার পর সবার শেষে থাকত নবদ্বীপ হালদারের কমিক।
নবদ্বীপ হালদার এর অন্তত চার-পাঁচখানা রেকর্ড শ্রোতাদের না শোনাতে পারলে গৃহস্থের বদনাম হত।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি এমনকি রেকর্ডেও এমন জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন নবদ্বীপ হালদার।
নবদ্বীপ হালদার অসংখ্য চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য :–পঞ্চাশর (১৯৩১), গ্রহের ফের (১৯৩৭), সোনার সংসার (১৯৩৬), সর্বজনীন বিবাহউৎসব (১৯৩৮), শহর থেকে দূরে (১৯৪৩), দুঃখে যাদের জীবন গড়া (১৯৪৬), কালো ছায়া (১৯৫৮)।
এছাড়া সাধারন মেয়ে (১৯৪৮), কুয়াশা (১৯৪৯), সন্ধ্যাবেলার রূপকথা (১৯৫০), কাঁকনতলা লাইট রেলওয়ে (১৯৫০), বৈকুণ্ঠের উইল (১৯৫০), মর্যাদা (১৯৫০), হানাবাড়ি (১৯৫২), মানিকজোড় (১৯৫২)।
আরও আছে সাড়ে চুয়াত্তর (১৯৫৩), লাখ টাকা (১৯৫৩), ময়লা কাগজ (১৯৫৪), ছেলে কার (১৯৫৪), নিষিদ্ধ ফল (১৯৫৫), সাহেব বিবি গোলাম (১৯৫৬), দুই বেচারা (১৯৬৯)।
নবদ্বীপ হালদারের কঠিন মায়া (১৯৬১), মরুতৃষা (১৯৬৪) -শতাধিক ছবিতে নানা ভূমিকায় অভিনয় করেছেন।
ব্যতিক্রমী গলার আওয়াজ আর অভিনয় গুণে দর্শকদের পেটে কাতুকুতু দিয়েছেন সিংহভাগ ছবিতেই। তাঁর হাস্যকৌতুকের লং প্লেয়িং রেকর্ড বের করেছিল বেশ কয়েকটি সংস্থা। কিছু কিছু ইউটিউবে শোনা যায়।
গত ২০১২ সাল ছিল নবদ্বীপ হালদারের জন্ম শতবর্ষ। কেউ মনে না রাখলেও তাঁকে উদযাপন করার এই উপলক্ষটি ভুলে যায়নি বর্ধমানের সোনাপলাশি গ্রামের মানুষ। এখানেই জন্মেছিলেন নবদ্বীপবাবু।
শেষবছর নবদ্বীপ হালদারের স্মরণে দু’দিন ধরে সভা করেন গ্রামবাসীরা। বর্ধমান জেলার কথ্য ভাষাকে তিনি তাঁর কমিকের মাধ্যমে জনপ্রিয় করে রেখে গেছেন। মাটির মানুষ ছিলেন।
নবদ্বীপ হালদার একজন প্রকৃত শিল্পীর মতো সারাজীবন অভিনয় নিয়েই ভেবে গিয়েছিলেন তাই বাড়ি-গাড়ি গুছিয়ে যাওয়া হয়নি তাঁর। এমনকী একটিমাত্র ভাঙা দেওয়াল ছাড়া তাঁর সোনাপলাশির জন্মভিটেটিতেও আজ আর কিছু নেই।
নবদ্বীপ হালদারের সংলাপ পরিবেশনের ধরন ও সময় জ্ঞান, শারীরিক ভঙ্গিমা বারবার মনে করিয়ে দেবে বাংলা সিনেমার একজন আন্তর্জাতিক মানের কৌতুকাভিনেতা হিসাবে। আজকের এই দিনে উনাকে গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।
