সারা বাংলা

​কাঠের গুঁড়িতে স্তব্ধ জীবনের সুর

​আবহমান বাংলার জীববৈচিত্র্যের সৌন্দর্যে যুগ যুগ ধরে মানুষ তার জীবন উৎসর্গ করে নির্মাণ করে গেছেন অন্যের জীবনের পটভূমি। কেউ সুবিশাল টাইটানিক-এর স্বপ্ন, কেউ আগ্রার মর্মর শুভ্র তাজমহল, আবার কেউবা ঢাকার বুকে লালবাগ কেল্লার পরি বিবির সমাধি সৌধ-এর মতো স্থাপত্যে অমরত্ব দিয়েছেন। এই সকল কালজয়ী নির্মাণ শৈল্পিকের গভীরে মিশে আছে এক শ্রেণীর মানুষের ঘাম ও রক্তের দাগ, যাঁরা নিজেদের জীবনকে বিলিয়ে বুনে গেছেন অন্যের স্বপ্ন।
​তেমনিভাবে জীবন-জীবিকার এক দুর্নিবার টানে মুন্সীগঞ্জের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠেছে অসংখ্য কাঠ চেরাইয়ের স-মিল। এই মিলগুলিতে কর্মরত শ্রমিকেরা দিন-রাত কাঠ চেরাইয়ের নিরন্তর কাজে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন, আর সেই কাঠ থেকেই তৈরি হয় মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঠের ঘর-বাড়ি। কিন্তু এই কর্মব্যস্ততার অন্তরালে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে আসা এই শ্রমিকদের জীবন বয়ে চলেছে এক মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির স্রোতে।

​সকাল থেকে রাত অবধি অবিরাম চলে কাঠ চেরাইয়ের কর্মযজ্ঞ। করাত মেশিনের তীব্র শব্দের সাথে সাথে, ধুলার মতো কাঠের গুঁড়ি বাতাসে উড়ে বেড়ায়, যা সহজে শ্রমিকদের নাক, মুখ ও শ্বাসনালী দিয়ে প্রবেশ করে। এই সূক্ষ্ম গুঁড়ি তাদের অজান্তেই নিঃশ্বাসের সাথে ঢুকে যায় ফুসফুস ও ল্যান্সে। জীবিকার দুর্বার টানে এবং অভাবের তাড়নায় হাসি মুখে কাঠ চেরাইয়ের মাধ্যমে তাঁরা বছরের পর বছর পার করে দেন এই প্রাণঘাতী স্বাস্থ্যঝুঁকিকে সঙ্গী করে। তাদের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাস যেন মিশে থাকে কাঠের ধূলিময় কণা, যা ধীরে ধীরে তাদের জীবনীশক্তিকে ক্ষয় করে দেয়। স-মিলে কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিকের শেষ জীবন কাটে শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা এবং অন্যান্য ফুসফুসজনিত মারাত্মক অসুস্থতায়, যার শেষ পরিণতি হয় শেষ ঠিকানায় নীরব প্রয়াণ।
​শ্রীনগর উপজেলার ছনবাড়ীর সংলগ্ন হরপাড়ায় অবস্থিত ভাই ভাই স-মিল-এ কর্মরত রংপুরের বাসিন্দা করিম মাদবর (৫০)-এর কণ্ঠে উঠে আসে এক করুণ আক্ষেপ। ক্ষুধার জ্বালায় জীবিকার তাগিদে এখানে এসে কাঠ ভাঙার কাজ করা এই মানুষটি বলেন:
​”শীতের রাতে ঠান্ডা কাশির কারণে ঘুম আসে না, মাঝে মাঝে বুক ব্যথা করে। সারাদিন নাক-মুখ দিয়ে শুধু কাঠের গুঁড়ি ঢোকে। কাশি দিলে থু থু নয়, কাঠের গুঁড়ি বেরোয়।”
​বগুড়া থেকে একই পেশায় আসা মফিজ চোকদার (৫৫), যিনি দীর্ঘ দশ বছর ধরে এই কঠিন কাজ করছেন, তার অভিজ্ঞতা আরও মর্মান্তিক:
​”আমি দশ বছর ধরে এ কাজ করছি। এখন আর আগের মতো পরিশ্রম করতে পারি না। মাঝে মাঝে দম বন্ধ হয়ে আসে। এছাড়া বড় বড় কাঠের গুঁড়ি টেনে আনতে খুব কষ্ট হয়।”
​তাদের প্রতিটি কথা যেন কাঠ চেরাই পেশার আড়ালে লুকিয়ে থাকা নীরব ঘাতক-এর বিরুদ্ধে এক ক্ষীণ প্রতিবাদ। এই মানুষগুলো নিজেদের স্বাস্থ্য বিসর্জন দিয়ে একটি পরিবারের জীবন বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, কিন্তু বিনিময়ে নিজেদের জন্য কিনে নিচ্ছেন এক নিশ্চিত অসুস্থতা ও অকালমৃত্যু।

​স-মিলটির মালিক মোকাজ্জল হোসেন নিজেও এই পেশার কঠিনতা স্বীকার করে বলেন:
​”কাঠ চেরাই করা কঠিন কাজ। সারাদিন নাক-মুখ দিয়ে শুধু কাঠের গুঁড়ি ঢোকে। আমি দূরে বসে থাকি, তাতেই আমার বুক ব্যথা হয়ে গেছে।”
​তিনি আরও জানান, কেবল স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, বর্তমানে এই পেশায় টিকে থাকাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। মজুরি বৃদ্ধি এবং ইদানীং কাজের অর্ডার কমে যাওয়ায় এখন এই পেশা ধরে রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
​ মুন্সীগঞ্জের কাঠ চেরাই স-মিল শ্রমিকদের জীবনের মূল্য এবং উপেক্ষিত স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে আলোকপাত করে। নির্মাণ শৈলীতে অন্যের জীবন সাজিয়ে দেওয়া এই কারিগরদের জীবন যেন আজ কাঠের গুঁড়ির ধোঁয়ায় ঢাকা এক ট্র্যাজেডি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button