​সাইড স্টোরি

অন্ধকারে মুন্সীগঞ্জের তারুণ্য

অন্ধকারে মুন্সীগঞ্জের তারুণ্য
জীবন গড়ার লড়াইয়ে শিক্ষিত তরুণ- তরুণীরা

​মুন্সীগঞ্জের নদীতীর বরাবর এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা খেলা করে। এই বিষণ্ণতা জল বা প্রকৃতির নয়, এ হলো সেই তারুণ্যের, যারা উচ্চশিক্ষার সনদ হাতে নিয়েও জীবনের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন। শহরের অলিতে-গলিতে এখন এক অলিখিত সত্য থমকে আছে: মেধার স্বীকৃতি নেই, শুধু দীর্ঘশ্বাস আর শূন্যতা।
​অনিক। এই গল্পটি মুন্সীগঞ্জের হাজারো অনিকের। দুই বছর আগে উচ্চ শিক্ষায় প্রথম শ্রেণির ফলাফল নিয়ে সে ফিরেছিল। তার চোখে ছিল পদ্মা সেতুর মতো দৃঢ়, ইস্পাত-কঠিন আত্মবিশ্বাস—নিজ জেলায় কিছু করার স্বপ্ন। কিন্তু মুন্সীগঞ্জ তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে কেবল হতাশা। স্থানীয় পর্যায়ে শিল্প, সরকারি বিনিয়োগ বা বৃহৎ অর্থনৈতিক করিডোরের অনুপস্থিতি তার স্বপ্নকে গিলে খেয়েছে।
​অনিকের মাস্টার্সের সার্টিফিকেটটি এখন তার কাঠের আলমারির শেষ তাকে চাপা পড়া এক ভারী পাথর—এক ব্যর্থতার প্রতীক। সে চাকরি খুঁজেছে, ইন্টারভিউ দিয়েছে, কিন্তু প্রচলিত গতানুগতিক শিক্ষায় শিক্ষিত অনিক আধুনিক, বাজার-চাহিদাভিত্তিক কারিগরি দক্ষতার অভাবে বারবার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে।
​”মাটি উর্বর, নদীর জল স্রোতস্বিনী, শুধু আমার ভবিষ্যৎটাই বন্ধ্যা হয়ে আছে,” এক সন্ধ্যায় ধলেশ্বরীর তীরে বসে সে স্বগতোক্তি করে। “এই সনদ কিসের দাম দিল, যদি পেটের ভাতই না জোটে?”

​যখন একজন শিক্ষিত যুবকের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, তখন তার মধ্যে জন্ম নেয় এক গভীর মানসিক হতাশা এবং পরিচয় সংকট। মনোবিদেরা একে চিহ্নিত করছেন ‘ব্যর্থতার ভয় থেকে জন্ম নেওয়া মনস্তাত্ত্বিক রোগ’ হিসেবে। এই মানসিক শূন্যতা পূরণের জন্য অনিকের মতো অনেকেই সহজলভ্য ‘ক্ষণিক মুক্তি’র দিকে ঝুঁকছে।
​মুন্সীগঞ্জের পাড়া-মহল্লায় এখন ইয়াবা, গাঁজা এবং ফেনসিডিলের মতো মাদকদ্রব্য প্রায় প্রকাশ্যে বিক্রি হয়। এই মাদক তখন বাস্তবতার কর্কশতা থেকে ক্ষণিকের জন্য দূরে থাকার একটি সহজ, কিন্তু ভয়ানক দরজা খুলে দেয়।
​সন্ধ্যার পর পুরোনো সেতুর নিচে কিংবা নির্জন খেয়াঘাটে জটলা বাড়ে। সেখানে অনিক খুঁজে পায় তার মতো আরও অনেক ‘বিপথগামী সহযাত্রী’। তাদের আলাপন আর চাকরির বাজার নিয়ে হয় না; আলাপ চলে হতাশার গভীরতা মাপতে এবং ক্ষণিকের নেশায় ডুবে থাকার চেষ্টা নিয়ে। ধূসর নিকোটিনের ধোঁয়ায় মেশে তাদের পোড়া স্বপ্নের কটু গন্ধ। তারা যেন এই শহর থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নিচ্ছে—এক নীরুদ্দেশ যাত্রার যাত্রী।

​এই নীরব সামাজিক সংকটের চরম মূল্য দিচ্ছে পরিবারগুলো। অনিকের মা, যিনি একসময় ছেলের কৃতিত্ব নিয়ে গর্ব করতেন, তিনি এখন প্রতি রাতে ছেলের ঘরে ফেরার অপেক্ষায় দরজা আঁকড়ে বসে থাকেন। তিনি জানেন না, তার ছেলের শরীরকে নয়, বরং তার স্বপ্ন, মেধা আর সম্ভাবনাকে গ্রাস করছে এই মাদকাসক্তি।
​পুলিশ ও প্রশাসনের মাদকবিরোধী অভিযান মাঝে মাঝে সক্রিয় হলেও, তা কেবল খুচরা বিক্রেতা বা আসক্তদের স্পর্শ করে। মাদকের উৎসমুখ এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, চাহিদাকে নির্মূল করতে পারছে না। কারণ, চাহিদার মূল কারণটি হলো এই অসহনীয় বেকারত্ব ও হতাশা।
​মুন্সীগঞ্জে মাদকাসক্তদের জন্য সরকারি ব্যবস্থাপনায় মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র বা বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা অপ্রতুল। ফলে অনিকের মতো যারা একবার এই ফাঁদে পড়ে, তাদের সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার পথ কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে যায়।

​মুন্সীগঞ্জের এই সংকট নিরসনের পথ লুকিয়ে আছে এই তারুণ্যে নতুন করে বিনিয়োগের মধ্যে। এই শিক্ষিত, অথচ কর্মহীন শক্তিকে গঠনমূলক কাজে লাগানোর এখনই সময়।
​দ্রুত সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে শিল্প পার্ক বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় পর্যায়ে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। পদ্মা সেতুর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে।
​ পুরনো, গতানুগতিক প্রশিক্ষণ নয়, বরং তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, এবং আধুনিক কৃষিনির্ভর শিল্পে বিশেষায়িত কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে।
​জেলার ছয়টি উপজেলাতেই পর্যায়ে মাদকাসক্তদের জন্য বিনামূল্যে মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসন সেবার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।
​সামাজিক সম্পৃক্তি: খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং স্বেচ্ছাসেবী কাজে তরুণদের যুক্ত করে তাদের হতাশা দূর করার উপর গুরুত্ব দিতে হবে।
​মুন্সীগঞ্জের তারুণ্যই জেলার আসল শক্তি। যদি এই শক্তিকে নেতিবাচক দিক থেকে ফিরিয়ে এনে গঠনমূলক কাজে লাগানো যায়, তবেই অনিক ফিরে পাবে তার হারানো স্বপ্ন। তাদের শূন্য দৃষ্টিতে আবার স্বপ্নের আভা ফেরানো গেলে, এই নিরুদ্দেশ যাত্রা বদলে যাবে সৃষ্টিশীল প্রত্যাবর্তনের গল্পে। মুন্সীগঞ্জের পোড়া স্বপ্নের শহর আবার আলো দেখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles

Back to top button