বিনোদন

হারানো সুর: নবান্নের ঢেঁকি নাচন

হারাতে বসেছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য – সত্য প্রতাশ

তাপস শ্রীনগর থেকে
​”ও ধান বানোরে ঢেঁকিতে পার দিয়া, ঢেঁকি নাচে আমি নাচি হেলিয়া দুলিয়া…”
​আবহমান বাংলার মাটির সাথে মিশে থাকা যে জীবনচিত্র, আধুনিকতার ঝোড়ো হাওয়ায় তা আজ শুধুই ধূসর স্মৃতি। শত শত বছরের গ্রামীণ ঐতিহ্যের সেই স্বর্ণালী অধ্যায় থেকে খসে পড়েছে কত চেনা দৃশ্য—কৃষকের লাঙ্গল-জোয়াল, রাখালের উদাস বাঁশি, হা-ডু-ডু কিংবা দাঁড়িয়াবান্ধার মতো গ্রামীণ খেলা, আর সব কিছুর কেন্দ্রে থাকা ধান ভাঙার ঢেঁকি। এই প্রজন্মের কাছে এগুলি এখন শুধুই নানী-দাদীর মুখে শোনা কিচ্ছা, এক কল্পলোকের অচেনা কাহিনি।
​ কালের গর্ভে হারানো সেই গ্রামীণ দিনলিপি
​একসময় সকালের শুরুটা হতো এক ভিন্ন ছন্দে। গোয়ালঘর থেকে গরু মাঠে নিয়ে যেত রাখাল, মাথায় ঝুড়ি নিয়ে কৃষক যেত হালচাষে। উনুনে হাঁড়ি চাপিয়ে মায়েরা ব্যস্ত হতেন সকালের আহার প্রস্তুতিতে—এগুলিই ছিল সেকালের নিত্যদিনের চিত্র। আর এই জীবনযাত্রার পরতে পরতে জড়িয়ে ছিল শ্রমের সুগন্ধ আর আত্মিক শান্তি।
​বিশেষ করে, হেমন্তের পর যখন আসে অগ্রহায়ণ মাস, তখন কৃষকের ঘরে ঘরে শুরু হতো বাঙালির শাশ্বত উৎসব—নবান্ন। আমন ধান কাটা শেষ হলে ঘরে উঠত নতুন চাল। আর এই নবান্নের প্রধান আকর্ষণই ছিল পিঠাপুলি তৈরির ধুম। এই সময়েই প্রাণ ফিরে পেত বাড়ির আনাচে-কানাচে পড়ে থাকা সেই কাঠের যন্ত্রটি—ঢেঁকি।

​নতুন ধানের চাল জলে ভিজিয়ে, হালকা শুকিয়ে শুরু হতো সেই চালকে গুঁড়ো করার মহাযজ্ঞ। বাড়ির বউ-ঝিরা, শাশুড়ি-ননদরা মিলে এক সুরে মেতে উঠতেন ঢেঁকির তালে তালে। তাদের পায়ে তালে তালে উঠত-নামত ভারী কাষ্ঠদণ্ড। ঢেঁকির ‘ধুপ-ধাপ’ শব্দে মুখরিত হতো চারপাশ, আর সেই শব্দের সাথে মিশে যেত তাদের লোকজ গান: “ও ধান বানোরে ঢেঁকিতে পার দিয়া…” সেই সুর যেন শুধু শ্রমের নয়, এক নিবিড় সম্পর্কের, এক আনন্দময় উৎসবের প্রতিধ্বনি।
​ কেন এই শূন্যতা?
​ঢেঁকি শুধু চাল তৈরির যন্ত্র ছিল না, এটি ছিল গ্রাম্য সংসারের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। নতুন চাল, ডাল, যব—সবকিছু পিষে প্রস্তুত করার একমাত্র মাধ্যম ছিল এটি। ঢেঁকিতে কোটা চালের ভাত কিংবা পিঠার স্বাদ ছিল অমৃতের মতো। আশি ঊর্ধ্ব হাজেরা খাতুনের আক্ষেপেই সেই সত্য প্রকাশ পায়, “ঢেঁকিতে কোটা চালের ভাত, পিঠা, পায়েস খাইতে কত না স্বাদ লাগতো, অহন পিঠা খাই কিন্তু কোনো স্বাদ পাই না।”
​ঢেঁকির সেই স্থান আজ দখল করেছে আধুনিকতা ও প্রযুক্তির দানব—রাইস মিল। বিদ্যুতের একটানা ঘরঘর শব্দে মুহূর্তেই ধান থেকে চাল আলাদা হয়ে যায়, কিন্তু সেই চালের গুঁড়োয় মিশে থাকে না কোনো শ্রমের ভালোবাসা, কোনো লোকজ সুর।
​মুন্সীগঞ্জ জেলার মতো একসময়কার সমৃদ্ধ গ্রামীণ জনপদেও আজ বাড়ি বাড়ি খুঁজেও একটি ঢেঁকি পাওয়া যায় না। সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া এই যন্ত্রটি বর্তমান প্রজন্মের কাছে এক অচেনা বস্তু। এই প্রজন্ম যখন ঢেঁকি দেখবে, তারা অবাক হবে, হয়তো হতবাকও হবে—ভাববে, এ কেমন যন্ত্র যা পায়ে চেপে চাল তৈরি করত!
​তবু, স্মৃতিতে ঢেঁকি রয়ে যাবে চিরকাল। এটি শুধু একটি কাঠের কাঠামো নয়, এটি আবহমান বাংলার লোকসংস্কৃতি, নবান্নের আমেজ এবং গ্রামীণ নারীর অপরিসীম শ্রমের নীরব সাক্ষী। ঢেঁকির সেই ‘ধুপ-ধাপ’ ছন্দ আজ না থাকলেও, বাঙালির হৃদয়ে এটি থাকবে এক হারানো সুর হয়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button